মাল্টিভার্সের সন্ধানে

আমাদের তৈরি করা হয়েছিল পৃথিবীর বাহিরে যাওয়ার জন্যই। স্পেসশিপে বেঁচে থাকার উপযোগী করে। অনেক গুলো বছরের প্রশিক্ষণ এবং অনুশীলনের শেষ হতে চলল। এর মধ্যে ঘোষণা হলো এস্ট্রোনমি এডমিনিস্ট্রেশন থেকে একটা আধুনিক স্পেসশিপ মাল্টিভার্সের সন্ধানে যাবে।যারা যারা যেতে ইচ্ছুক, তারা যেন সাইন-আপ করে নেয়।

আমার একটুও আগ্রহ ছিল না যাওয়ার। স্পেসশিপের ছোট্ট গণ্ডির ভেতর বাকি জীবন কাটিয়ে দেওয়ার একটুও ইচ্ছে নেই। যদিও এখন আমরা পৃথিবীতে যেভাবে থাকি, তা স্পেসশিপের আবদ্ধ গন্ডি থেকে একটুও কম না। কাঁচ দিয়ে আবদ্ধ একটা পার্কে আমাদের বসবাস। বাহিরের আলো বাতাস বিষাক্ত হয়ে যাওয়ার পর বিশাল বিশাল কাঁচে ঘেরা পার্ক তৈরি করা হয়েছিল। এর ভেতর ছোট ছোট টাওয়ার তৈরি করেই মানুষেরা বসবাস করছে।

বাহিরের পরিবেশে যেতে ইচ্ছে করে খুব। কিন্তু যাওয়া নিষেধ। মাঝে মধ্যে শুনা যায় যে বাহিরের পরিবেশ নাকি আস্তে আস্তে ঠিক হচ্ছে। অনেক গুলো রোবট দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে বাহিরের পরিবেশের দূষণ কমানোর জন্য। অনেক অগ্রসর হয়েছে তারা। এক দিন বাহিরের পরিবেশে বের হয়ে মন ভরে নিশ্বাস নিব, এই চিন্তা করেই স্পেসে যেতে ইচ্ছে করে না আমার।

যারা সাইন-আপ করেছে, তাদের লিস্টে চোখ যাওয়ার পর একটা নাম দেখে কিছুটা থমকে গেলাম। এলিসা। এলিসা যাচ্ছে এই প্রোগ্রামে? আমি নিজেও সাথে সাথে সাথে সাইন-আপ করে নিলাম।

দুঃখী দুঃখী মেয়েটাকে দেখে আমার কি যে মায়া হয়। পৃথিবীতে আর তার কেউই বেঁচে নেই। পার্ক গুলো তৈরি করার আগেই তার পুরো ফ্যামিলি ইফেক্টেড হয়ে মারা যায়। সেই কোন ভাবে বেঁচে ছিল। পৃথিবীতে কেউ না থাকার কারণেই হয়তো সে রাজি হয়ে যায়। আর আমি রাজি হই শুধু মেয়েটির পাশা পাশি থাকার জন্যই। কি যে ইচ্ছে করে তার কিছুটা দুঃখ ভাগাভাগি করে নিয়ে নিতে।

আমাদের স্পেসশিপটা এত বিশাল। এত সব আধুনিক প্রযুক্তি। আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে খুঁজে বের করা সত্যিকারে কোন মাল্টিভার্স রয়েছে কিনা। যদি থাকে, এক মাল্টিভার্স থেকে অন্য মাল্টিভার্সে কিভাবে যাওয়া যায় এসব নিয়ে গবেষণা করা। অনেক রিসার্চার এবং রোবট নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। আমার কাজ হচ্ছে স্পেসশিপের সব কিছু ঠিক মত কাজ করছে কিনা, তা মনিটর করা। সবই অটোমেটেড। তেমন কোন কাজ না থাকায় অবজারভেটরি ডেস্কে গিয়ে মহাকাশের বিশালতা অবাক হয়ে দেখি।

এলিসার কাজ হচ্ছে রিসার্সে সাহায্য করা। মাঝে মধ্যে কাজের ফাঁকে আমাদের কথা হয়। বলা যায় শুধু এই সময়টুকুর জন্যই আমি অপেক্ষা করি। কথা বলে বুঝা যায় সব কিছুতেই তার কেমন অনীহা। মাঝে মাঝে তাকে বলি, দেখো না, যদি আমরা মাল্টিভার্সের সন্ধান পাই, হয়তো তুমি তোমার ফ্যামিলির সাথে আবারও দেখা করতে পারবে। যদিও তুমি বলতে পারো তারা তোমার ফ্যামিলি না। কিন্তু তোমার ফ্যামিলি মেম্বারের মত তো হবে! সে একটুও আগ্রহ পায় না।

এলিসা এক সময় সব ইচ্ছে হারিয়ে ফেলে। দেখা হলেই কেমন জানি শুষ্ক শুষ্ক মনে হত তাকে। পরে জানলাম সে সব রকম নিউট্রিশন নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। যখন জানতে পেরেছি, ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে। খুব দেরি হয়ে গিয়েছে। এলিসা মারা যায়… আমি কেমন একা হয়ে যাই। এই বিশাল স্পেসশিপটার মধ্যে এত মানুষ, এত রোবট থাকা সত্ত্বেও আমি কেমন একা হয়ে যাই। আমার খুব একা লাগতে শুরু করে।

মাল্টিভার্স বা স্পেস সম্পর্কে আগে এত বেশি আগ্রহ না পেলেও কেন জানি আমি আস্তে আস্তে আগ্রহ পেতে থাকি। যদি সত্যিই মাল্টিভার্স থাকে। যদি সত্যিই অন্য কোন পৃথিবীতে এলিসাকে দেখতে পারি। স্পেসশিপ মনিটরের পাশা পাশি এখন মাঝে মধ্যে রিসার্সের আপডেট ও নেই। তারা কোন টানেলের সন্ধান পেয়েছে কিনা। যেখান দিয়ে অন্য কোন ডাইমেনশনে চলে যায় যাবে। যে ডাইমেনশনে আরেকটা পৃথিবী রয়েছে, যেখানে এলিসা রয়েছে। কেমন একটা আশা, হয়তো সত্যিই অন্য কোন ডাইমেনশনে দেখা হয়ে যাবে… মেয়েটির সাথে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *