দুবাই ভ্রমণ – ডেজার্ট সাফারি এবং স্কাইডাইভ

ভিসা এবং ফ্লাই

স্কাইডাইভের জন্য খুব সুন্দর একটা জায়গা হচ্ছে দুবাই। দুবাই স্কাইডাইভের ভিডিও প্রায় সময়ই দেখতাম ভাবতাম আমিও একদিন ট্রাই করব। আল-আমিন ভাই দুবাই গিয়েছে ঘুরতে। উনাকে নক দিয়েছি জানার জন্য ভিসা কিভাবে পাওয়া যায়। উনি একটা লিঙ্ক দিল। দেখলাম ভিসা পাওয়া সহজ। হানিমুন ট্যুরস এবং ট্রাভেলস ভিসা প্রসেস করে দেয়। ১০৯০০ টাকা ভিসা প্রসেসিং ফি, আর সিকিউরিটি ডিপোজিট হিসেবে দেড় লক্ষ টাকা জমা দিতে হয়। যা দুবাই থেকে ঘুরে ফিরে আসলে ফেরত দেওয়া হবে। যে নিউজ দেখে গিয়েছি ওদের ঐখানে, দেখলাম ঐখানে লেখা ছিল ৩০ মিনিটেই ভিসা দেওয়া হয়। বাস্তবে আসলে আমাকে ১৮ দিন পর ভিসা দিয়েছে। এয়ার টিকেট ও ওদের থেকেই নিয়েছি। রিটার্ণ টিকেট ৪০ হাজার টাকায়। এমিরেটসে আসার ইচ্ছে ছিল, জেট এয়ারে এমিরেটস থেকে কম টাকা লেগেছিল টিকেট কিনতে। সমস্যা একটাই। কানেক্টিং ফ্লাইট। দুবাই যাওয়ার সময় দিল্লিতে স্টপেজ আর দুবাই থেকে ফেরার পথে মুম্বাইতে স্টপেজ।

আমি ভিসা পাওয়ার পর দেখলাম আরো অনেক ট্রাভেল এজেন্সিই দুবাই ভিসা করে দেয়। ভিসা করতে শুধু পাসপোর্ট আর এক কপি ছবি লাগে। এক এক ট্রাভেল এজেন্সি প্রসেসিং ফি এক এক রকম নেয়।

আমার ফ্লাইট ছিল ২৯ তারিখ, সকাল দশটায়। আমি সকাল সকাল রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। উবারে করে। সিএনজি থেকে উবার পাওয়া সহজ, কিছু কিছু ক্ষেত্রে খরচ ও কম।

এয়ারপোর্ট এসে বোর্ডিং পাস নেওয়ার জন্য অপেক্ষা। বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় এয়ারলাইন্সের কর্মী সব চেক করল। আমি রিটার্ণ টিকেট কেটেছি কিনা, হোটেল রিজার্ভেশন রয়েছে কিনা, কোন কোন দেশে ঘুরেছি সব। এরপর বোর্ডিং পাস দিল। বোর্ডিং পাস নেওয়ার পর ইমিগ্রেশন।

ইমিগ্রেশনের লাইনে দাঁড়ানোর পর দেখলাম কারেন্ট চলে গেলো। কারেন্ট চলে যাওয়ার পর ইমিগ্রেশনও বন্ধ। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। এরপর কারেন্ট আসল। যখন ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে গেলাম, আমাকে একদিক দেখিয়ে বলল ঐখানে স্যারের সাথে কথা বলেন। ঐখানে গেলাম। প্রশ্ন করা শুরু করল। কি করি, কোথায় যাবো, কেনো যাবো, বাবা কি করে, ভাই কি করে, কোথায় থাকি, টাকা পেলাম কই, আমি এত বড় চাকরি করেও দুবাই ঘুরতে যেতে পারি না, আপনি কেমনে যান? ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্ন করতে করতে কারেন্ট আবার গেলো। ইমিগ্রেশন অফিসার এবার তার পরিচিত কয়েক জন আসছে, তাদের সাথে গল্প শুরু করল। আমি দাঁড়িয়ে থাকায় বলল কারেন্ট নেই, এখন চেক করা যাবে না, দেরি হবে।

আমি আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে কারেন্ট আসার অপেক্ষা করলাম। বোর্ডিং এর সময় হয়ে যাচ্ছে। পরে বললাম চাইলে মোবাইলেই ভিসা চেক করা যায়। বলল আপনার মোবাইলে চেক করে দেখান। আমি দেখালাম। এরপর উনি অন্য আরেকজনকে বলল, প্যাসেঞ্জার অনেক স্মার্ট, নিজে নিজেই চেক করেছে। ঐ ইভিসার প্রিন্ট কপির শেষে লিখে দিল ওকে পাস… আমি আবার ইমিগ্রেশন অফিসারের কাছে গেলাম। এরপর ডিপারচার সিল মেরে দেওয়ার পর বড় একটা দির্ঘশ্বাস ফেললাম। যাক বাবা, একটা ইমিগ্রেশন পার হয়েছি। দুবাই ইমিগ্রেশনে আবার কি কি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়, আল্লাহ জানে!

আমাদের ফ্লাইট ছিল ১০টায়। ঢাকা থেকে দিল্লি। সময় মতই বিমানে উঠেছি আমরা। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শুনি বিমানের পাওয়ারে কোন সমস্যা। তাই দেরি হচ্ছে। এরপর আরো কিছুক্ষণ পর জানালো ঠিক করা হয়েছে। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই টেকঅফ করবে। কিন্তু টেকঅফ করতে গেলে এবার শুরু হয় ঝড় বৃষ্টি। পাইলট জানালো ফ্লাই করার জন্য সব প্রস্তুত। কন্ট্রোল রুম থেকে অনুমতি দিলেই ফ্লাই করবে। এভাবে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হলো। ১০টার ফ্লাইট ১২টায় ছাড়ল। তাও ছেড়েছে। এর থেকে বেশি দেরি হলে দিল্লি থেকে দুবাই এর ফ্লাইট মিস করতে হতো।

দিল্লি পৌছার পর দেখলাম দুবাই এর ফ্লাইট এর সময় প্রায় এক ঘণ্টা বাকি। সিকিউরিটি চেক, বোর্ডিং গেটে যেতে যেতেই প্রায় আধাঘণ্টা শেষ হয়ে গেলো। এরকিছুক্ষন পরই বোর্ডিং। বিমানে উঠে রওনা দিলাম দুবাই এর দিকে। ঠিক মতই সব কিছু সম্পর্ণ হলো।

দুবাইতে প্রথম দিন – রবিবার – ২৯ এপ্রিল

দুবাই এয়ারপোর্টে নেমে নামাজ পড়ে নিলাম। ছোট ছোট নামাজের রুম রয়েছে। এরপর গেলাম ইমিগ্রেশনের দিকে। বিশাল একটা লাইন। সম্ভবত অনেক গুলো বিমান এক সাথে ল্যান্ড করেছে। আস্তে আস্তে এগুতে থাকলাম। ভাবছিলাম এখানে কি আবার জিজ্ঞেস করে। ইমিগ্রেশন অফিসারের দিকে পাসপোর্ট আর ই-ভিসার কপি দেওয়ার পর আমাকে বলল ক্যামেরার দিকে তাকাতে। ক্যামেরার দিকে তাকানো পর বলল বড় বড় করে তাকাতে। আমি যতটুকু পারা যায় বড় করে তাকাচ্ছি। কিন্তু এরপর ও আবার বলল বড় করে তাকাতে। আমি চোখ বড় করে তাকানোর চেষ্টা করলাম। এরপর জিজ্ঞেস করল নাম কি? আমি বললাম। এরাইভাল সিল মেরে পাসপোর্ট এবং ভিসা কপি রিটার্ণ দিলো। আর কিছুই জিজ্ঞেস করল না বা চেক করল না।

আমি এয়ারবিএনবিতে হোস্টেল বুকিং দিয়েছিলাম। তা হচ্ছে ক্যাপিটাল টাওয়ার নামক একটা বিল্ডিং এ। দেশে থাকতে গুগলে সার্চ করে জেনে রেখেছিলাম কিভাবে পৌঁছানো যায়। এয়ারপোর্ট থেকে মেট্রো ট্রেন রয়েছে। মেট্রো ট্রেন থেকে নেমে একটা বাসে উঠলেই এখানে পৌঁছানো যাবে। এয়ারপোর্ট এসে মেট্রো ট্রেনের টিকেট কাউণ্টার থেকে টিকেট কেটে নিলাম।

প্রথম দিকে একটু বুঝতে কষ্ট হচ্ছিল কোন দিক না কোন দিক যাবো। পরে মেট্রো ট্রেন কোন দিকে যায়, স্টপেজ কোনটা কোথায়, ইত্যাদি দেখে নেওয়ার পর সব পরিষ্কার হলো। মেট্রো ট্রেনে উঠে পড়লাম। মেট্রো থেকে রাতের শহর দেখা যাচ্ছিল। দেখা যাচ্ছিল ব্যস্ত দুবাই। বিশাল বিশাল বিল্ডিং গুলো। এক সময় বুর্জ খলিফাও নজরে পড়ল। আস্তে আস্তে গন্তব্যে চলে আসলাম। মেট্রো থেকে নেমে ৫ মিনিটের মত হেঁটে মেট্রো স্টেশন থেকে বের হলাম। বের হওয়ার পরই দেখলাম যে বাসে উঠতে হবে, তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। ঐটাতে উঠে পড়লাম। এক মিনিটেই পরের গন্তব্য। মেট্রোর টিকেট যেটা কিনেছি, ঐটা এই বাসেও ব্যবহার করা গেলো। পরের স্টপেজে নেমে গেলাম। এরপর আমার হোস্টেল খুঁজে বের করলাম।

ছোট্ট একটা রুমে আটটা বেড। দুবাই সিঙ্গেল রুম মোটামুটি কস্টলি। এয়ারবিএনবি থেকে এই হোস্টেল খুঁজে পেয়েছি। ব্যাকপ্যাকারদের জন্য চমৎকার। ঘুমানোর যায়গা ছোট হলেও ড্রয়িং রুম বড় রয়েছে, কিচেন, আড্ডা দেওয়ার রুম সহ রিলাক্সে থাকার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা রয়েছে।

ব্যাকপ্যাক রেখে বের হয়ে পড়লাম। এশার নামাজ পড়তে হবে। একটু খুঁজে মসজিদ বের করলাম। বিশাল একটা মসজিদ। সুন্দর করে সাজানো। নামাজ পরে এরপর মনে হলো খেতে হবে। চারপাশে প্রচুর রেস্টুরেন্ট রয়েছে, রয়েছে সুপারশপ। Broccoli নামে একটাতে ঢুকলাম। এরপর পাস্তা দিয়ে রাতের খাবারের কাজ সেরে নিলাম। সমস্যা হচ্ছে এত গুলো পাস্তা দিয়েছে যে আমার অনেক সময় লেগে গিয়েছে খেতে। খাওয়া দাওয়া করে হোস্টেলে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

সোমবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে সিম কিনতে বের হয়েছি। ইন্টারনেট ছাড়া কোথাও যাওয়া কষ্ট। গুগল ম্যাপের জন্য হলেও ইন্টারনেট দরকার। আমি DU এর কেয়ারে এসে একটা সিম কিনে নেই। সিম ৫৮ দিরহামের মত আর সাথে ১১০ দিরহাম নিয়েছি নেট কেনার জন্য। এখানে মোবাইল ইন্টারনেট আমাদের তুলনায় অনেক কস্টলি। সিম কিনে রওনা দিলাম বীচ এরিয়ার দিকে। রক্সি থিয়েটারের কাছে। ইনফিনিটি ওয়ার মুভিটি দেখার জন্য।

সকাল সাড়ে দশটা তখন। নাস্তা করা হয়নি। একটা রেস্টুরেন্টে বসে নাস্তা করে নিলাম। টাকস সম্ভবত নাম। ডিম, মাংস এবং ভাত। এরপর মুভি থিয়েটারে গিয়ে টিকেট কেটে নিলাম। থিয়েটারের দরজা আমি নক করার পরই খুলল। আমিই প্রথম টিকেট কাটলাম। এরপর বীচ পাড়ের দিকে চলে গেলাম। বীচ পাড়ে অনেক মানুষ। অনেকেই ট্যান নিচ্ছে রোঁদে শুয়ে। দাঁড়িয়ে থাকার উপায় নেই। প্রচুর গরম। আমি কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে একটা ক্যাফেতে বসলাম। ফ্রেস জুস অর্ডার দিলাম। এখানে প্রচুর পর্যটক। জুস খেতে খেতে সমুদ্র এবং মানুষ দেখতে লাগলাম, নানান রঙের মানুষ।

JBR Beach

মুভির সময় হলে মুভি দেখতে চলে আসি। মুভি দেখে বের হয়ে নামাজ পড়ার জন্য মসজিদ খুঁজে বের করি। এরপরের গন্তব্য হচ্ছে স্কাইডাইভ দুবাই। পথে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকি। আল শরাফ নামে। দুপুরের খাবার খেতে হবে। একটা সেট মেনু অর্ডার দেই। গত রাতে একবার পাস্তা অর্ডার দিলে বিশাল এক বাটি পাস্তা দেয়। অনেক কষ্ট হয় শেষ করতে। আজ আবার দেখি অনেক গুলো খাবার দিয়ে গেলো।

রেস্টুরেন্ট এর ওয়েটার গুলো খুবি সুইফট। দ্রুত সব করে। একটা টিস্যু ফেললে তাও দ্রুত সরিয়ে নেয়। খাওয়া দাওয়া করে বের হলাম।

গেলাম স্কাইডাইভ এর দিকে। ওদের ঐখানে গিয়ে জানতে চাইলাম অনস্পট বুকিং করা যায় কিনা। জানালো অনলাইনে করতে হয়। অনলাইনে করলে সাধারণত ৩ থেকে ৪ দিন আগে করে রাখতে হয়। কারণ শিডিউল পাওয়া যায় না, তাই। এ জন্যই অনস্পটে গিয়েছিলাম। জানালো চাইলে যে দিন স্কাইডাইভ দিব, ঐদিন গিয়ে অপেক্ষা করতে পারি। কেউ কোন কারণে স্কাইডাইভ না দিলে তার স্পটে দেওয়ার সুযোগ হবে। কিন্তু তার কোন গ্যারান্টি নেই। সারাদিন নষ্ট হতে পারে। তাই অনলাইনে বুকিং দিলেই ভালো হবে।

অনলাইনে বুকিং দিতে গেলে ১০০০ দিরহাম কেটে নিবে কার্ড থেকে। বাকিটা যে দিন স্কাইডাইভ, ওইদিন দেওয়া যাবে। তাদের ওয়েব এড্রেস skydivedubai.ae।

স্কাইডাইভ দুবাই

কোন এক্সপেরিয়েন্স ছাড়া যে স্কাইডাইভ দেওয়া যায়, তা হচ্ছে Tandem skydive। যেখানে একজন ইন্সট্রাকটরের সাথে আপনি জাম্প দিবেন। Tandem skydive দেওয়ার দুইটা লোকেশন রয়েছে এদের। একটা হচ্ছে ডেজার্টে আরেকটা হচ্ছে পাম ড্রপ জোনে। পাম ড্রপ জোন থেকে দুবাই এর সুন্দর ভিউ পাওয়া যায়, দেখা যায় পাম জুমাইরা, ওয়ার্ল্ড আইল্যান্ড ইত্যাদি। পাম জুমাইরাতে প্রাইস ও বেশি, তারপরও আমি পাম ড্রপজোনে স্কাইডাইভ করার জন্য বুকিং দিয়ে রাখি অনলাইনে।

মঙ্গলবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে নিলাম। আমাদের হোটেলের এখানেই ব্রেকফাস্ট করা যায়। দশ দিরহামে ব্যুফে নাস্তা। দারুণ সব আইটেম। অনেক গুলো ফ্রেশ ফ্রুট ছিল। সেগুলো বেশি ভালো লেগেছে।

নাস্তা করে রওনা দিলাম Al Barsha Pond পার্কের দিকে। পার্কটা মোটামুটি বড়। ভেতরে একটা বড় সড় পুকুর, দিঘী বলা যায় । চারপাশে সবুজ গাছপালা। দুবাইতে যে জিনিসটা সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ মনে হয়, তা হচ্ছে এই সবুজ গাছ। এগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় সারাক্ষণ। পুকুরের চারপাশে দৌড়ানোর জন্য ট্র্যাক রয়েছে। পার্কে বিভিন্ন ফুল গাছে সুন্দর সব ফুল ফুটে রয়েছে। দেখতে ভালো লাগে।

Al Barsha Pond পার্কের এক পাশে

পার্কে কিছুক্ষণ থেকে রওনা দিলাম এমিরেটস মলের দিকে। মোটামুটি বড় সড় একটা শপিং মল। আমাদের বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্কের মতই। মলে ঘুরাঘুরি করলাম কিছুক্ষণ। জামা কাপড়ের দাম দেখলাম। একটা টি সার্টের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে দুবাই এয়ারফেয়ার হয়ে যাবে। সেই তুলনায় বাংলাদেশে আমরা দারুণ সব জামা কাপড় কিনতে পারি অনেক কম টাকায়। এখানে দেখলাম পার্কিং ছাদে। বিশাল এরা জুড়ে পার্কিং।

ডেজার্ট সাফারিতে যাওয়ার জন্য বুকিং দিয়ে রেখেছি। ৩টার দিকে রওনা দেওয়ার কথা। আমি এমিরেটস মলের ঐখানে কিছুক্ষণ থেকে উবার নিয়ে রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। এখানে উবারে দারুণ সব গাড়ি পাওয়া যায়। এবার পেলাম Lexus ES। পাকিস্তানি ড্রাইভার। পাবলিক বাসও রয়েছে। বাসের খরচ ও অনেক কম। অটোমেটেড। মেট্রো বা বাসের জন্য কার্ড রয়েছে। উঠা নামার সময় সে কার্ড দিয়ে অটোমেটেড টাকা পে করা যায়। বাস গুলো খালিই থাকে। একটা কারণ হচ্ছে বাসে করে এদিক সেদিক যেতে প্রচুর সময় লাগে। মনে হয় না নষ্ট করার মত সময় এখানে যারা থাকে, তাদের রয়েছে। তাছাড়া যে সব বাস স্টপেজে কোন ছাউনি থাকে না, সেগুলোতে দাঁড়িতে থাকা কষ্টকর।

হোটেলে ফেরার কিছুক্ষণ পর ডেজার্ট সাপারির গাড়ি আসলে আমি উঠে পড়লাম। আরো দুই হোটেল থেকে ৪ জন গেস্ট নিল। এরপর রওনা দিলাম মরভূমির উদ্দেশ্যে। মরভূমির কাছাকাছি একটা জায়গায় থেমে গাড়ির চাকার হাওয়া কমিয়ে নিল। আমারা ঢাকা চট্রগ্রাম যাওয়ার পথে যেমন কুমিল্লা থামি, তেমন। ড্রাইভার বলল পানি বা জুস খেলে এখান থেকে খেয়ে নিতে পারি। গাড়ির চাকার হাওয়া কমিয়ে নেয়ার কারণ হচ্ছে বালিতে ড্রাইভ করার সময় যেন ভালো কন্ট্রোল পাওয়া যায়, সে জন্য। দুবাই শহরে এত গরম লাগেনি এই মরভূমির কাছে নেমে যত গরম লাগল। এত গরম যে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কষ্টের।

এবার গাড়ি ড্রাইভ করা শুরু করল বালির উপর দিয়ে। বালি সমান থাকলে সমস্যা থাকত না। সমস্যা হচ্ছে উঁচু নিচু, ছোট ছোট পাহাড়ের মত। ড্রাইভার এই উঁচু নিচুতে ড্রাইভ করা শুরু করল। আমার কাছে মনে হচ্ছিল যেন রোলার কোস্টারে উঠে পড়েছি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যেন গাড়ি এক দিকে কাত হয়ে পড়ে যাবে, আবার মনে হচ্ছিল বুঝি উল্টে যাবে। এমন ভয়ঙ্কর অনুভূতি আমি রোলার কোস্টারেও পাইনি। ভয়াবহ হলেও দারুণ লাগছিল আমার কাছে। অনেকক্ষণ ধরে মরুভূমিতে ড্রাইভ করে আমাদের একটা ক্যাম্পে নিয়ে গেলো। আল মারজান ডেজার্ট সাফারি ক্যাম্প নামে।

ডেজার্ট ক্যাম্প

ক্যাম্পে বাকি সময় কাটিয়েছি আমরা। এখানে উট ছিল, গোড়া ছিল, হাতে মেহেদি দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, ডেজার্টে চালানোর মত বাইক ছিল। সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত মরভূমির এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করলাম। বিকেলের দিকে গরম লাগার পরিমাণ কমে আসল। মরভূমিতে সূর্যাস্ত দেখলাম এরপর রওনা দিলাম ক্যাম্পের দিকে।

মরুভূমি

ক্যাম্পে তখন স্ন্যাক্স দিচ্ছিল। ফ্রেন্স ফ্রাই, ড্রিঙ্কস। ক্যাম্পের মাঝখানে স্টেজ। চারপাশে বসার জায়গা। বসলাম। একটু পরি ডিনার সার্ভ করা হলো। বুফ্যে ডিনার। বার-বি-কিউ, রুটি, রাইস, সাওমিন ও অন্যান্য কারি। খাবার নিয়ে আবার স্টেজের কাছে বসলাম। শুরু হলো বিভিন্ন স্টেজ শো। প্রথমে ছিল বেলি ড্যান্স। এরপর একটা ছেলে সুন্দর নাচছিল। শেষে ফায়ার ড্যান্স। ভালো লাগছিল। ডেজার্ট সাফারির পুরা খরচ ছিল মাত্র ১৫০ দিরহাম। এক্সপেরিয়েন্সের তুলনায় প্রাইস কমই বলা যায়। সব শেষে রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। মরভূমি নিয়ে আমার অনেক কৌতূহল ছিল, আজ সব কৌতূহল মিটল।

আজ সারাদিন এত বেশি হাঁটাহাঁটি করেছি যে খুব ক্লান্তি লাগছিল। হোটেলের কাছে এসে মসজিদে চলে গেলাম। হোটেলের কাছাকাছি যে মসজিদ, তা হচ্ছে হামেল আল গাইথ মসজিদ। নামাজ পড়ে রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম।

বুধবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে নিলাম। কোথাও যেতে ইচ্ছে করছিল না তাই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। ১২টার দিকে উঠে রুম চেক আউট করে বের হয়ে পড়লাম। নতুন রুমে উঠব। এই তিন দিন ছিলাম ইন্টারনেট সিটিতে। এখন যাচ্ছি দুবাই ম্যারিনাতে। কাছা কাছি। প্রায় ৭ কিলো মিটার দূরত্ব। উবারে গাড়ির জন্য রিকোয়েস্ট দিলাম। এক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি চলে আসল। এখানে উবারের ওয়েটিং টাইম অনেক কম। সব সময়ই সহজেই গাড়ি পাওয়া যায়। এছাড়া পাওয়া যায় দারুণ সব গাড়ি। বাংলাদেশে যেগুলো কেনার কথা চিন্তাও করতে পারি না, সেগুলোতে এখন চড়ার সুযোগ হচ্ছে। এবারও পেয়েছি Lexus ES। দশ মিনিটের মধ্যেই ম্যারিনাতে পৌঁছে গিয়েছি।

এখানে রুম হচ্ছে ম্যারিনা হাইটস নামক একটা বিল্ডিং এ। ৪১ তলায় এপার্টমেন্ট। নতুন করে সব সাজাচ্ছে। এসে দেখলাম আমিই এক মাত্র গেস্ট। জানলাম আমি তৃতীয় ক্লায়েন্ট। পুরা এপার্টমেন্ট অনেক সুন্দর করে সাজানো। ৪১ তলায় হওয়ায় সুন্দর ভিউ দেখা যায়। শেয়ার্ড এপার্টমেন্ট। কমন এরিয়া যে সবাই ব্যবহার করতে পারে। বেড রুমে অনেক গুলো বেড থাকে। বাজেটের মধ্যে দারুণ। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ কাজ কর্ম করে বিকেলের দিকে বের হলাম ম্যারিনা দেখার জন্য। এই এলাকাটা অনেক বেশি সুন্দর। এখানেই রয়েছে ৯০ ডিগ্রি টুইস্টেড বিল্ডিং। যার ডিজাইনার এবং বুর্জ খলিফার ডিজাইনার গ্রুপ একই – Skidmore, Owings & Merrill ।

ম্যারিনা লেকের পাশ ধরে হাঁটতে হাঁটতে ম্যারিনা মলের দিকে গেলাম। ৩ তলায় ফাস্ট ফুড কোর্ট গুলো। বার্গার আর কফি খেলাম আর দেখলাম চারপাশে সুন্দর ভিউ। এরপর আস্তে আস্তে নিচে নামলাম। কেউ জগিং করে, কেউ হাঁটাহাঁটি করে, কেউ বসে আছে। মানুষ জন খুব কম। প্রচুর ট্যুরিস্ট। কি সুন্দর লাগে। এখানে সেকেন্ড হ্যান্ড বই বিক্রি হচ্ছে দেখলাম। মাত্র ১০ দিরহাম বা এর কাছা কাছি দামে। একটি কিনে নিলাম। এরপর হাঁটতে লাগলাম এপার্টমেন্টের দিকে। ফেরার পথে সুপারশপে ঢুকে কিছু ফল, ব্রেড, জুস ও ডিম কিনে নিলাম রাতে এবং সকালে খাওয়ার জন্য।

এপার্টমেন্ট থেকে দিনে যত সুন্দর ভিউ দেখা যাচ্ছিল, রাতে আরো বেশি সুন্দর লাগছিল। রাতে কিছুক্ষণ কাজ করলাম। এরপর ঘুমিয়ে পড়লাম।

রাতের দুবাই

বৃহস্পতিবার

সকালে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা করে রওনা দিলাম বুর্জ খলিফার দিকে। রুমের কাছা কাছি মেট্রো স্টেশন। মেট্রো স্টেশনে যাওয়ার জন্য প্রথমে ট্রামে ছড়লাম। এক স্টপেজ পরেই মেট্রো স্টেশন। মেট্রোতে উঠে রওনা দিলাম বুর্জ খলিফার দিকে। রাতে বুর্জ খলিফার ১২৪ এবং ১২৫ তলায় উঠার টিকেট কেটে রেখেছি। গুগল ম্যাপে সার্চ করলে কিভাবে যেতে হবে, কোন সময় কোন বাস বা মেট্রো, কত সময় লাগবে, সব বলে দেয়।

At the top এর টিকেট কাউন্টার রয়েছে দুবাই মলের নিচে। ঐখানে গিয়ে অনলাইন কপি দেখানোর পর টিকেট দিল। তা নিয়ে রওনা দিলাম বুর্জ খলিফার দিকে। যাওয়ার পথে দুই পাশে মনিটরে বুর্জ খলিফা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য দেখাচ্ছিল। কত সালে তৈরি করা শুরু হয়েছে, কোন বছর কত তলার কাজ শেষ হয়েছে সব তথ্য। দেখতে দেখতে এক সময় চলে গেলাম লিফটের কাছে। সেখানে একটু ভিড় রয়েছে।

লিফট একটানা ১২৪ তলায় উঠে যায় ৬০ সেকেন্ডেরও কম সময়ে। এটি হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে স্পিডি লিফট। ১২৪ তলা থেকে চারদিক কি সুন্দর দেখা যায়। অন্যান্য বিল্ডিং গুলো অনেক নিচে দেখা যায়। নিচের মানুষ বোঝা যায় না। ঘুরে ঘুরে দেখে এরপর আবার নেমে গেলাম। টিকেট কেনার সময় সম্ভবত বলা হয় ২ ঘণ্টার জন্য টিকেট। কিন্তু ঐখানে সম্ভবত যতক্ষণ ইচ্ছে ততক্ষণ থাকা যায়।

বুর্জ খলিফা থেকে দুবাই শহর

দুবাই মল ও অনেক সুন্দর। সব কিছু এত পলিসড। দুবাই মল থেকে বের হলে দুবাই ফাউন্টেন দেখা যায়। বিকেলের দিকে ঐটা প্রতি ২০ মিনিট পর পর চালু করে ৩-৫ মিনিটের জন্য। গানের সাথে সাথে পানির নাচ সাথে লাইটিং। কি সুন্দর দেখায়। এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফাউন্টেন। বুর্জ খলিফার পেছনের দিক দিয়ে এই ফাউন্টেন। বুর্জ খলিফার সামনেও ছোট কিছু সুন্দর ফাউন্টের রয়েছে।

দুবাই মলের ভেতরে রয়েছে একুরিয়াম এবং আন্ডারওয়াটার জু। একুরিয়ামটি আসলে দুবাই মলের নিচ তলা থেকেই বেশি সুন্দর লাগে। একুরিয়ামের ভেতর না গেলেও হয়। কিন্তু আন্ডারওয়াটার জু দেখার মত। কত বিচিত্র সব সামুদ্রিক মাছ এবং প্রাণীর সংগ্রহ। এছাড়া একুরিয়ামে নাকি ২২০০০ এর মত মাছ রয়েছে। এই একুরিয়ামের মধ্যে কিছু এক্সপেরিয়েন্স নেওয়া যায়। যেমন বোট রাইড, ভার্চুয়াল ট্যুর, মাছকে খাবার খাওয়ানো ইত্যাদি। এগুলো ভালো লাগার মত। এগুলোর জন্য টিকেট হচ্ছে ১৭৫ দিরহাম এর মত। যা বুর্জ খলিফার ১২৪ তলার টিকেট থেকেও বেশি। বুর্জ খলিপার ১২৪ এবং ১২৫ তলায় উঠার টিকেট ১৩৫ দিরহাম। কেনা যাবে atthetop.ae সাইট থেকে। এছাড়া চাইলে ১৪৭ তলায় উঠার টিকেট ও কেনা যায়, তা কেনা যাবে ৩৭০ দিরহাম দিয়ে।

রাতের বেলা বুর্জ খলিফা লাইটিং করা হয় প্রতি ২০ মিনিট পর পর। ঐটাও অনেক বেশি সুন্দর লাগে। লাইটিং দেখলাম ফাউন্টেন এবং দুবাই মল যে দিকে, সে দিকের অর্ধেকে করা হয়। এত বিশাল একটা বিল্ডিং, উপর থেকে নিচ পর্যন্ত পুরোটাতেই গানের সুরের সাথে লাইটিং, কি অসাধারণ সে দৃশ্য।

দুবাই ফাউন্টেন – সত্যিকারের সৌন্দর্য ক্যামেরাতে তোলা যায়নি

বুর্জ খলিফার কাছাকাছি গিয়ে উপরের দিকে দিকে তাকালে মনে হবে যেন কাত হয়ে আছে। হয়তো আমার কাছেই তেমন মনে হচ্ছিল। সারাদিনই বুর্জ খলিফা এবং দুবাই মলের এখানে কাটিয়েছি। এরপর রওনা দিলাম দুবাই ম্যারিনার দিকে, আমি যে এপার্টমেন্টে থাকব, সেখানে। মেট্রোতে করে।

বুর্জ খলিফা লাইটিং করা অবস্থায় – সত্যিকারে আরো সুন্দর

রাত দেখলাম আমি যে এপার্টমেন্টে থাকি, ঐখান থেকে বুর্জ খলিফা দেখা যায়। দিনের বেলা খেয়াল করিনি। রাতে লাইটিং থাকার কারণে দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। পরে দেখলাম দুবাই এর প্রায় জায়গা থেকেই বুর্জ খলিফা দেখা যায়।

শুক্রবার

আজ নজরুল ভাই এর সাথে ঘুরতে যাওয়ার কথা। উনি এবং উনার ফ্রেন্ডরা মিলে ফুজাইরাতে যাবে। ঐটা পাহাড়ি এরিয়া। আমি সকালে যখন ঘুম থেকে উঠেছি, তখন প্রায় দুইটা বাজে। মোবাইলে দেখি প্রায় ৩০টা কল। এত গুলো কল অথচ একবারও মোবাইল ভাইব্রেট করেনি। ভাইব্রেশন টেস্ট করে দেখলাম ঠিকই আছে। আমি জানি না কেন এমন আচরণ করল মোবাইল। প্রচণ্ড মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। উনারা আমার জন্য নাকি ১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। এছাড়া আজকে আমার অন্য কোন প্ল্যান ও ছিল না। আরো বেশি কষ্ট লেগেছে কারণ জুমার নামাজ পড়তে পারিনি।

বিকেলের দিকে বের হলাম ইবনে বতুতা শপিং মলের দিকে। এর আগে কাছা কাছি কোথাও যেতে উবারে করে যেতাম। এবার ট্যাক্সি করে গেলাম। উবার থেকে ট্যাক্সিতে খরচ কম। শুরুর ভাড়া ৫ দিরহাম, এরপর মিটারে। ইবনে বতুটা শপিং মল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় থিম শপিং মল। মুসমিলদের বিভিন্ন আবিষ্কার এবং কর্ম নিয়ে বিভিন্ন ভাষ্কর্য রয়েছে এখানে।

সন্ধ্যার দিকে ম্যারিনার দিকে ফিরে এলাম। এখানে বিভিন্ন মলের সামনে থেকে উঠতে গেলে শুরুর ভাড়া ১২ দিরহাম। একটু হেঁটে অন্য কোন জায়গা থেকে উঠলে শুরুর ভাড়া ৫ দিরহামেই উঠা যেত। অনেক কিছুই শিখছি এখানে এসে। রুমের কাছা কাছি একটা সুন্দর মসজিদ রয়েছে। বাহির থেকেই অনেক সুন্দর। ভেতরে দেখি আরো বেশি সুন্দর। যদিও বেশির ভাগ মসজিদই সুন্দর এখানে। মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়লাম। এরপর ম্যারিনার চারপাশে হাঁটা হাঁটি করে রুমে ফিরলাম।

এ কয়েক দিন দুবাই থেকে দুবাইতে কিভাবে চলতে হয় তা শিখলাম। সব ব্যবস্থাই অনেক সুন্দর। সত্যিকারের একটা আধুনিক শহর। সকল নাগরিক সুবিধে রয়েছে। বাস, ট্রাম, মেট্রো রয়েছে যাতায়াতের জন্য। কোন জ্যাম নেই বললেই চলে। এখানে হেঁটে রাস্তা পার হওয়ার ব্যবস্থাও কত সুন্দর। রাস্তা পার হতে চাইলে অন্য গাড়ি গুলো দাঁড়িয়ে যায়। হেঁটে পার হতে চাইলে বাটন রয়েছে, তা প্রেস করলে সিগনাল দিবে যাওয়ার জন্য। পথচারীর প্রাধান্য সবার আগে।

শনিবার

আজ নতুন আরেকটা হোস্টেলে মুভ হয়েছি। এর আগে ছিলাম ৪১ তলার একটা এপার্টমেন্টে। এবার ৬৬ তলার একটা হোস্টেলে। এখানে মুভ করার একটাই কারণ, সুন্দর ভিউ। আগেরটাতেও সুন্দর ভিউ ছিল। আগেরটা থেকে দেখা যেত শহরের ভিউ। এখন দেখা যাচ্ছে সমুদ্রের ভিউ এবং The Palm এর ভিউ। পাম জুমাইরা হচ্ছে কৃত্তিম দ্বীপ। দুবাই এর স্কাই থেকে যত ছবি নেওয়া হয়, প্রায় গুলোতেই এই পাম আইল্যান্ডের ছবি থাকে। পাম জুমাইরা নিয়ে একটা মজার তথ্য হচ্ছে এটিতে যত ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার করা হয়েছে তা দিয়ে পৃথিবীর চার দিকে দুই মিটার উঁচু এবং ০.৫ মিটার চওড়া ওয়াল তিনবার দেওয়া যাবে। এবং এটি নাকি স্পেস থেকে খালি চোখেই দেখা যায়। সবচেয়ে মজার ব্যপার হচ্ছে এখানের এপার্টমেন্ট বা ভিলা গুলোর দাম অনেক বেশি থাকা সত্ত্বেও প্রথম ধাপে তৈরি করা সব গুলো (প্রায় ৪০০০) ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়।

হোস্টেলের সব কিছুই অনেক সুন্দর ভাবে গোছানো, ম্যানেজ করা হয়। সর্বদাই কেউ না কেউ থাকে রিসিপশনে। কমন রুমে সুন্দর বসার জায়গা রয়েছে, পড়ার জন্য বই রয়েছে। কিচেনে যে কোন সময় খাওয়ার জন্য চা অথবা কফি রয়েছে। নিজের খাবার কিনে এনে ফ্রিজে রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। রান্না করতে চাইলে নিজে নিজে রান্না করার ব্যবস্থা রয়েছে। আর সকালে রয়েছে ব্রেকফাস্টের ব্যবস্থা। রুম গুলো মোটামুটি বড়। এর আগে যে রুম গুলোতে ছিলাম, সে গুলো থেকেও বড়। এবং রুমে একটা টেবিলও রয়েছে কাজ করার জন্য। প্রতিটা রুমে রয়েছে ৮টি বেড। ব্যাঙ্ক বেড বলে এগুলোকে। একটার উপর আরেকটা। অনেক সুন্দর করে গোছানো। বেড থেকে সুন্দর সমুদ্র দেখা যায়। ২০ ডলার প্রতি রাতের জন্য। যে সব সুবিধে পাওয়া যায়, আমার কাছে মনে হয় এই ২০ ডলার যথেষ্ট কম।

বিকেলের দিকে বের হয়েছি। দুবাই ম্যারিনাতে ওয়াটার বাস রয়েছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়া যায়। ট্যুরিস্টরা সাধারণত এগুলোতে উঠে ম্যারিনা এলাকাটা দেখে। আমিও টিকেট কেটে উঠে পড়লাম। সন্ধ্যার দিকে ফিরে এলাম হোটেলের কাছা কাছি। এশার নামাজ পড়ে রুমে চলে এলাম। এরপর একটু কাজ করার চেষ্টা করলাম।

গ্রোসারি আইটেমের জন্য বিশাল বিশাল সুপার শপ রয়েছে। দুই তিনটা বিল্ডিং এর মধ্যেই একটা করে এরকম সুপারশপ রয়েছে। কিছু ফল, পানি, জুস ইত্যাদি কিনে নিলাম খাওয়ার জন্য।

রবিবার

আজ স্কাইডাইভ করার কথা। চার দিন ২ তারিখে অনলাইনে বুকিং দিয়ে রেখেছি। চেকইন টাইম ছিল সকাল ১১.১৫ মিনিটে। স্কাইডাইভ দুবাই এর পাম ড্রপজোন আমার রুম থেকে দেখা যায়। দেখা যায় প্যারাসুট দিয়ে মানুষ নামতে।

নাস্তা করে রওনা দিলাম স্কাইডাইভ এর অফিসের দিকে। কাছে হলেও এত রোদের মধ্যে হাঁটা অসম্ভব। ট্যাক্সিতে উঠে রওনা দেই। যাওয়ার পর দেখি কেউ কেউ প্রিপারেশন নিচ্ছে। পাইলটেরা প্যারাসুট ঠিক করছ ইত্যাদি। আমি যাওয়ার পর একটা ফরম দিল। এরপর ওজন মেপে নিল। বেশি ওজন হলে স্কাইডাইভ দেওয়া যায় না। ফরমের মূল কথা হচ্ছে আমি মরে গেলে বা আমার কোন ক্ষতি হলে আমি স্কাইডাইভ দুবাই এর কাউকে আইনের আওতায় আনব না, তার এগ্রিমেন্ট। ফরম পূরণ করার পর তা জমা দিলাম। এরপর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমাকে ডাকল।

অনলাইনে ৯৯৯ দিরহাম নিয়েছিল বুকিং এর সময়। বাকি ১২০০ দিরহাম এখন পেমেন্ট করতে হবে। কার্ড বা ক্যাশ যে কোন ভাবেই দেওয়া যায় পেমেন্ট। পেমেন্ট শেষে আমাকে একটা টোকেন দিল। বলল বলল আমার ইন্সট্রাকটর আমাকে ডেকে নিবে। কিছুক্ষণ পর ইন্সট্রাকটর আসল। আমাকে জাম্প দেওয়ার জন্য বেল্ট পরিয়ে তৈরি করে নিল। এরপর ইন্সট্রাকশন দিল কখন কি কি করতে হবে। জাম্প দেওয়ার সময় কিভাবে থাকতে হবে, প্যারাসুট খোলার সময় কিভাবে থাকতে হবে, ল্যান্ড করার সময় কিভাবে থাকতে হবে ইত্যাদি। বলল ভুলে গেলেও সমস্যা নেই। প্লেনে আবার বলা হবে।

প্রতিটা জাম্পারের জন্য একজন ইন্সট্রাকটর থাকে, যে জাম্পারকে নিয়ে জাম্প দেয়। আর থাকে একজন করে ফটোগ্রাফার। শুধু ছবি আর ভিডিও করাই যার কাজ। সে শুধু জাম্প দেয় ছবি এবং ভিডিও করার জন্য। কিছুক্ষণ পর আমার ভিডিও করল। আমার অনুভূতি কেমন, বাড়ির কারো জন্য কোন মেসেজ আছে কিনা ইত্যাদি।

এর কিছুক্ষন পর আমরা রওনা দিলাম বোর্ডিং এরিয়াতে। স্কাইডাইভ এর নিজস্ব এয়ারপোর্ট। প্লেনে উঠলাম। উঠার সাথে সাথেই প্লেন টেকঅফ করল দিল। উপরের দিকে উঠতে থাকল। প্রায় ১৩০০ মিটার উঠার পর আমরা জাম্প দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। শেষ বারের মত আবার ভিডিও করল। উপরে একটু ঠান্ডা। প্লেনের দরজা খোলার পর মনে হচ্ছিল যেন এন্ট্রারটিকায় চলে এসেছি, ঠাণ্ডা হাওয়া এসে গায়ে লাগছিল। তখন যদিও ঠাণ্ডার দিকে মনোযোগ দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। কারণ হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছিল। একের পর এক জাম্প দিচ্ছিল।

আমার ক্যামেরাম্যান প্রথমে জাম্প দিল, এর পর পর আমরা। প্রায় ৬০ সেকন্ডের মত নিচের দিকে নামছিলাম। ক্যামেরাম্যান ছবি তুলছিল। কোন প্যারাসুট ছাড়া কিছু ছাড়া। এই সময়টুকু কোন অনুভূতি ছাড়াই কেটে যায় বলতে গেলে। এত বেশি বাতাসের প্রেশার সে কিছুই বোঝা যায় না। আমি এখনো বুঝতে পারি না নিচের দিকে পড়ার সময় কিভাবে নিজেকে কন্ট্রোল করে এভাবে ছবি তুলতে পারে! এরপর প্যারাসুট ওপেন করে। প্যারাসুট ওপেন করলে মনে হয় যেন আবার উপরের দিকে উঠে যাচ্ছি। প্যরাসুট খোলার পরের সময় গুলো অনেক আস্তে আস্তে কাটে। ইন্সট্রাকটর গ্লাইড করে করে চারপাশ দেখায়। দেখতে দেখতে নিচের দিকে নামতে থাকি। এক সময় ল্যান্ড করি। ল্যান্ড করাটা জাম্প দেওয়া থেকেও সহজ। অনেক বেশি সহজ। পুরা প্রসেসে আমাকে কিছুই করতে হয় নি। যা করার, সব করেছে ইন্সট্রাকটর।

লাফ দেওয়ার সময়
প্যারাসুট খোলার পর

ল্যান্ড করার প্রায় ৪০ মিনিট পরে ফটো এবং ভিডিও গুলো দেওয়া হয়। ভিডিও এবং ফটো গুলো স্কাইডাইভের লোগো সহ একটা পেনড্রাইভে করে দিয়ে দেওয়া হয়। এই তো। স্কাইডাইভের মূল অংশ ২০ মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। এখানে ভিডিওটি দেখা যাবেঃ

আমার গায়ে নাসার লোগো যুক্ত একটা টিসার্ট ছিল। তো ইন্সট্রাকটরা আমাকে জিজ্ঞেস করতেছিল আমি নাসাতে জব করি কিনা। আমি বললাম না। এরপর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে, বলতে পারো। কাউকে বলব না। আমি হাসি। বলি না। এরপর জিজ্ঞেস করে এরিয়া ৫১ সম্পর্কে কি জানি, ইত্যাদি নানা প্রশ্ন। বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমি নাসাতে জব করি না। পরে জিজ্ঞেস করে টিসার্ট কই পেলাম। আমি বলি আমাদের দেশে শপিং মলে পাওয়া যায়। প্লেনেও জিজ্ঞেস করছিল। মজা পাচ্ছিলাম। এছাড়া ইন্সট্রাকটররা প্লেনে বসেই মজা করছিল। যারা আমরা জাম্প দিব, তাড়া কি যে নার্ভাস। আর ওদের কাছে খেলনার মত। জাম্প দেয়। ল্যান্ড করে। আবার জাম্প দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়। ওদের কাছে এটা এত ইজি একটা ব্যপার।

সব শেষে হোটেলে ফিরে আসি। বিকেলের দিকে ম্যারিনাতে হাঁটাহাঁটি করি। রাতে বের হই দুবাই শহর দেখতে। ইমাম ভাই উনার র‍্যাঞ্জ রোবার নিয়ে এসেছিল। উনি দুবাইতে থাকেন। এখানে ব্যবসা আছে। আমরা সারজা ষ্টেটের কাছা কাছি একটা রেস্টুরেন্টে গিয়েছি। ফুড ভিলেজ নামে। যেখানে বাংলাদেশি খাবার পাওয়া যায়। সার্ভও করে বাংলাদেশী মানুষ। ঐখানে গিয়ে ইলিশ, গরুর মাংস, বেগুণ ভাজা, পোলাউ খেয়ে রওনা দিলাম পুরাণ দুবাই এর দিকে। তারপর পাম জুমাইরাতে। এসব ঘুরে হোস্টেলে ফিরে এলাম।

সোমবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে আবার ঘুমালাম। অথচ ইচ্ছে ছিল ওয়াটারপার্কে যাওয়ার। কিন্তু ঘুমানোকে প্রাধান্য দিলাম। ঘুমাতে ইচ্ছে করছিল খুব। বিকেলের দিকে ঘুম থেকে উঠে গেলাম ইমাম ভাইয়ের বাসায়। ঐখানে বসে কিছুক্ষণ কাজ করে আমরা বের হলাম ঘুরতে।

মার্সেডিজে করে রওনা দিলাম JBR এর দিকে। এটা বীচ এরিয়া। প্রচুর পর্যটক আসে এই দিকে। এলাকাটাও অনেক সুন্দর করে সাজানো। একটা রেস্টুরেন্টে বসে আমরা মাসল এবং বীফ স্টেক খেলাম। এরপর বীচের দিকে কিছুক্ষণ হাঁটলাম। এভাবে করতে করতেই রাত ১২টা বাজল। এরপর আমাকে আমার হোটেলের সামনে ড্রপ করে ইমাম ভাই চলে গেলো।

JBR Beach এরিয়াতে

মঙ্গলবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে আবার ঘুমিয়েছি। কেন জানি দেশের মত রুটিন হয়ে গেলো। আরেকটা কারণ হচ্ছে দিনের বেলা এখানে প্রচুর গরম। এখন যদিও গরমকাল নয়। তারপরও প্রচুর গরম। আমি জানিনা গরম কালে এরা কিভাবে বের হয়।

৩টার দিকে বের হয়ে Big Bus এ উঠলাম। বিগ বাস হচ্ছে শহর ঘুরে দেখার জন্য স্পেশাল বাস সার্ভিস। এরকম আরো সার্ভিস রয়েছে। আমি ২ তারিখের দিকে বিগ বাসের টিকেট কেটে নিয়েছি ৫ দিনের। এই পাঁচ দিন আমি যে কোন জায়গা থেকে যে কোন সময় এদের বাসে উঠতে পারব, যে কোন জায়গায় নামতে পারব। এটাকে বলে Hop-on Hop-Off সিস্টেম। আর ৫ দিন হচ্ছে ওপেন ডে। যে কোন ৫ দিন ব্যবহার করতে পারব। ২ তারিখে কিনলেও এত দিন ব্যবহার করিনি। যদিও এ কয়েক দিন আমার দুবাই এর প্রায় জায়গাই ঘুরা হয়ে গিয়েছে। দুবাই এর ট্রান্সপোর্টেশন সিস্টেম দারুণ। ট্রাম, মেট্রো, পাবলিক বাস সবই রয়েছে। ঘুরার জন্য বিগবাস বা এমন সার্ভিস না নিলেও হয়। শুধু জানতে হয় কোথায় কি রয়েছে। বাকিটা গুগল ম্যাপে সার্চ দিলেই কিভাবে যেতে হবে, বলে দিবে। কাছা কাছি কোথায় হলে তার জন্য ট্যাক্সি বা উবার তো আছেই।

একদিন বিগ বাসে ঘুরে দেখলাম ৫ দিনের টিকেটের দরকার হয় না সর্বোচ্চ দুইদিনের টিকেট কাটলেই দুবাই এর প্রায় সুন্দর সব জায়গায় ঘুরা যাবে। বিগবাস টিকেটের সাথে আরো কিছু সুবিধে পাওয়া যায়, যেমন মিউজিয়াম গুলোর ফ্রি এন্ট্রি, ডেজার্ট ট্যুর, ইত্যাদি। আমি আজ বলা যায় পুরা শহরেই একটা ট্যুর দিয়ে ফেলছি। কোথাও নামা হয়নি। বাস যে সব র‍্যুটে যায়, তার আসে পাশে কি রয়েছে, সব দেখলাম। এরপরের দিন গুলোতে নেমে নেমে দেখব হয়তো।

সন্ধ্যার দিকে ছিলাম দুবাই মলে। আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর শপিং মল। সব কিছু এত বেশি এত সুন্দর এখানে। দুবাই মলের পাশেই দুবাই ফাউন্টেন এবং বুর্জ খলিফা। ফাউন্টেন দেখতে খুব ভালো লাগে। প্রথম দিন যখন আসি, তখন অনেকক্ষণ দেখেছি। আজ আবার দেখতে ইচ্ছে করল। গানের সাথে সাথে পানির কারুকাজ। দেখতে কার না ভালো লাগবে। এছাড়া বুর্জ খলিফার ২০ মিনিট পর পর লাইটিং টাও দারুণ লাগে।

আমি দুবাই মল যাওয়ার পর ইমাম ভাই কল দিল। উনি কল দিল বের হওয়ার জন্য। পরে যখন শুনেছে আমি দুবাই মলে, উনি চলে আসল। শহরের এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মত লাগে মাত্র। দারুণ রাস্তা। উনি আসার পর আমরা একটা রেস্টুরেন্টে বসলাম। উনি অর্ডার দিল সালাদ আইটেম আমি দিলাম স্টেক। ল্যাম্ব চপ। গত কাল এবং আজ আমি সবচেয়ে এক্সপেন্সিভ খাবার অর্ডার দিলাম। আমাদের দেশের তুলনায় এখানের প্রায় কিছুই এক্সপেন্সিভ।

খাওয়া দাওয়া করে শপিং মলে একটু হাঁটাহাঁটি করে বের হলাম। রওনা দিলাম ম্যারিনার দিকে। পথে কোস্টার কফি থেকে কফি নিয়ে নিলাম। গতকাল রাতে ইমাম ভাই এর মার্সেডিজে আমার সেলফি স্টিক ফেলে গিয়েছি। উনি আজ বের হয়েছে রেঞ্জ রোবার নিয়ে। পরে উনার বাসায় গেলাম। সেলফি স্টিক নেওয়ার পর আমাকে আমার হোস্টেলে ড্রপ করে দিল। সাথে দুবাইতে একটা নাইট রাইড ও হয়ে গেলো।

বুধবার

সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করে রেডি হয়ে নিলাম। আজ আবু ধাবি যাবো। এয়ারবিএনবিতে এক্সপেরিয়েন্স হিসেবে বুকিং করে রেখেছি। আগের দিন রাতে হোস্ট আমাকে জানালো আমার হোটেল থেকে পিক করে নিবে। সাড়ে দশটার দিকে গাড়ি আসল। আমরা রওনা দিলাম আবু ধাবির দিকে। আবুধাবি দুবাই থেকে কাছেই। প্রায় দেড় ঘণ্টার মত লাগে। UAE এর রাজধানী হচ্ছে আবুধাবি। অনেক চওড়া রাস্তা। জ্যাম নেই।

আমাদের প্রথমে নিয়ে গেলো ফেরারি ওয়ার্ল্ডে। ফেরারি ওয়ার্ল্ড এর সাধারণ এরিয়াতে ঘুরতে দেখেছি। ফেরারি ওয়ার্ল্ডে অনেক গুলো রাইড রয়েছে। এগুলোর একটি হচ্ছে রোলার কোস্টার যা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি স্পিডি রোলারকোস্টার। জেনারেল এরিয়াতে শপিং করার জায়গা রয়েছে, দূর থেকে দুই একটা ফেরারি দেখা যাবে এই তো। ফেরারি ওয়ার্ল্ড থেকে রওনা দিলাম পরবর্তী স্পটে।

এর পরের স্পট ছিল হেরিটেজ ভিলেজ। যেখানে আজ থেকে ৫০ বছর আগেও এই অঞ্চলের মানুষ কিভাবে থাকত, তাদের ঘর বাড়ি কেমন ছিল তেমন কিছু ঘর রয়েছে। মজার ব্যপার হচ্ছে ৫০ বছর আগেও দুবাই বা আবু ধাবি এত উন্নত ছিল না। তেলের খনি আবিষ্কারের পর থেকে এই অঞ্চলের চেহারা পরিবর্তন হয়ে যায়। অল্প কয়েক বছরেই এসব অঞ্চলে আধুনিক শহর গড়ে উঠে। হেরিটেজ ভিলেজে কিছুক্ষণ থাকলাম। সব কিছু ঘুরে দেখলাম। এখান থেকে সুন্দর সমুদ্রের ভিউ পাওয়া যায়। ভিউ উপভোগ করতে হলে রোঁদে যেতে হবে। এত বেশি গরম বাহিরে, দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়ে যায়। বেশিক্ষণ না থেকে চলে আসতে হল।

হেরিটেজ ভিলেজ থেকে রওনা দিলাম আবু ধাবি ম্যারিনা মলের দিকে। দুবাই ম্যারিনা মল থেকে অনেক ছোট একটি মল। আধুনিকতার দিক দিয়ে দুবাই ম্যারিনা মল অনেক আধুনিক। দুবাই এর মল গুলো দেখার পর আবু ধাবি মল দেখে মনে হচ্ছিল অন্য কোন দেশে চলে এসেছি। অথচ আবুধাবি হচ্ছে UAE এর রাজধানী। ম্যারিনা মলে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম এরপর রওনা দিলাম গ্র্যান্ড মসজিদের দিকে।

আমার দেখা সবচেয়ে সুন্দর মসজিদ এই Sheikh Zayed Grand Mosque। এটি দেখতে প্রচুর মানুষ আসে। দেখার মত একটা মসজিদ। যে কোন ধর্মের লোকই দেখতে পারে এই মসজিদ। মেয়েরা যারা বোরকা না পরে আসে তাদের জন্য বোরকার ব্যবস্তা রয়েছে। এই মসজিদ দেখতে এসে অন্য ধর্মের সবাইও বোরকা পরতে হচ্ছে!

Sheikh Zayed Grand Mosque – সামনা স্যামনই মসজিদটি অনেক সুন্দর। অনেক বিশাল এবং সূর্য বিপরীত দিকে থাকায় সুন্দর করে ছবি তুলতে পারিনি।

মসজিদ দেখে রওনা দিলাম দুবাই এর দিকে। আমি সকালে বের হওয়ার সময় হোস্টেল চেকআউট করে বের হয়েছি। নতুন একটা হোস্টেলে উঠব। এটি হচ্ছে JBR এরিয়ায়। হোস্টেলে এসে কিছুক্ষণ রেস্ট নিলাম। সন্ধ্যার পর ইমাম ভাই কল দিল। উনি আসার পর আমরা রওনা দিলাম La Mer এর দিকে। এটি ও বীচের পাড়। সুন্দর ট্যুরিস্ট স্পট। একটা রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম। এরপর La mer এর হাঁটাহাঁটি করলাম। আমাকে এরপর আমার হোস্টেলের সামনে নামিয়ে দিল। ফেরার পথে রাতের দুবাই শহর দেখলাম। দিনের থেকে রাতে বেশি সুন্দর লাগে শহরটি।

বৃহস্পতিবার

আজ গিয়েছি একুয়াপার্কে। একুয়াভেঞ্চার একুয়াপার্ক। এটা হচ্ছে পাম জুমেইরা এর ভেতরে। অনেক গুলো রাইড রয়েছে এটাতে। টিকেট হচ্ছে ৩৪০ AED এবং লকারের জন্য নিয়েছে ৪০ AED।
আমি গিয়েছি শর্ট প্যান্ট পরে। সুতির। ভেতরে জাওয়ার পর জানালো এটা পরলে হবে না। সুইমিং ড্রেস লাগবে। বিশেষ করে নাইলনের প্যান্ট। পার্কের ভেতরে প্যান্ট কেনা যায়। আমি ১৫৫ AED দিয়ে পরে একটা প্যান্ট কিনে নেই। যেটা ঢাকায় আমাকে ফ্রি দিলেও নিতাম না।

শুরু করেছি স্লাইডিং দিয়ে। সমস্যা হচ্ছে বিশাল লাইন। লাইন ধরতে ধরতেই অনেক সময় পার হয়ে যায়। স্লাইডিং করে এরপর কোস্টারে করে পুরা ওয়াটার পার্কের চারপাশে একবার ঘুরেছি। এরপর চলে গিয়েছি Poseidon’s Revenge রাইডে। এটা পুরাটাই ফ্রি ফল। একটা টানেলের ভেতর গ্লাসের উপর দাঁড়াবেন। এরপর গ্লাসটা সরিয়ে ফেলবে। আপনি নিচের দিকে পড়তে থাকবেন ৬০ কিলোমিটার পার আওয়ারে। বলতে গেলে একবারে সোজা টানেল। চিৎকার করেও লাভ নাই, কেউ শুনবে না!

এরপর বডি স্লাইডিং নামে একটা রাইড দিয়েছি। এটিও টানেলের ভেতর। কোন কোস্টার ছাড়া স্লাইডিং। একবার উপরের দিকে, একবার নিচের দিকে এভাবে করতে করতেই এক সময় শেষ হলো। ছোটবেলায় এটার ছোট ভার্সনটা উপভোগ করতাম পুকুর পাড়ে। পাড়ের উপর থেকে স্লাইড করে নিজের দিকে নামা। কি যে সুন্দর দিন ছিল সেগুলো। যদিও বেশিক্ষণ পুকুরে থাকার জন্য মাইর খেতে হতো। ঐটা অত সুখের ছিল না!

শেষ যে রাইডটা দিয়েছি তা হচ্ছে Leap Of Faith। ৯তলা বিল্ডিং এর উপর থেকে লাফ দেওয়ার মতই। আরেকটা ফ্রি ফল রাইড। টানেলটা একটা একুরিয়ামের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। আর একুরিয়ামে শার্ক সহ অনেক গুলো সামুদ্রিক মাছ রয়েছে। স্বচ্ছ টানেল হলেও কিছুই দেখার সুযোগ হবে না। স্লাইড শুরু করার পরই চোখে অন্য কিছু না দেখেই ভয় পেতে পেতে শেষ হয়ে যাবে। এই রাইড গুলোতে প্রচুর থ্রিল! থ্রিলিং এর জন্যই বার বার দিতে ইচ্ছে করে। সমস্যা হচ্ছে বিশাল লাইন, তাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর দেইনি।

একা একা যে রাইড গুলো দেওয়া যায়, সব গুলোই দিয়েছি। একটা ছিল গ্রুপ রাইড, ঐটা দেওয়ার সুযোগ হয়নি। পাশেই সমুদ্র ছিল। সমুদ্রে নেমে কিছুক্ষণ সাঁতার কাটলাম। সমুদ্রের এই পাশে কোন ঢেউ ছিল না। অনেকটা পুকুরের মত মনে হচ্ছিল। সমুদ্রে গোসল করে পার্ক থেকে বের হলাম। এরপর চলে এলাম রুমে।

রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে হাঁটতে বের হলাম। আমি এখন থাকি JBR এলাকায়। বীচের পাশে। বীচের পাশে দারুণ করে সব সাজানো। কিছুক্ষণ হেঁটে একটা রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম। এরপর রুমে ফিরে এলাম।

শুক্রবার

আজ জুমা বার। নামাজ পড়তে হবে। কাছা কাছি মসজিদ দেখেছি দুবাই ম্যারিনাতে। ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে রওনা দিলাম মসজিদের দিকে। মসজিদে প্রচুর মুসুল্লি। দুবাই এর এই অংশে বেশির ভাগই বিদেশি। তাই মসজিদের বেশির ভাগও বিদেশী। বিভিন্ন দেশের মানুষ ঘুরতে এসেছে। কেউ এই এলাকার রেসিডেন্স। এত বেশি বৈচিত্র্য আমি আর কোন মসজিদে দেখিনি।

দেশের অভ্যাস। দেরি করে ঘুম থেকে উঠা। ঘুম থেকে উঠেই মসজিদে চলে এসেছি। মসজিদ থেকে বের হয়ে নাস্তা করে নিলাম। এরপর রুমে গিয়ে আবার কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নিলাম। বিকেলের দিকে বের হয়ে JBR এলাকায় হাঁটাহাঁটি করলাম। দুবাই এর বেশির ভাগ বীচই প্রাইভেট। JBR এর এখানে পাবলিক বীচ রয়েছে। তাই দিনের বেলা সারাক্ষণই প্রচুর মানুষ থাকে। বীচের পাড়ে রয়েছে হাঁটার জন্য দারুণ জায়গায়। প্রচুর মানুষ হাঁটাহাঁটি করে। বসার জন্যও সুন্দর জায়গা রয়েছে।

JBR এর কাছেই হচ্ছে ম্যারিনা। হাঁটতে হাঁটতে ম্যারিনা মলের দিকে গেলাম। আমার দেখা সুন্দর শপিং মল গুলোর একটা। সব কিছু এত সুন্দর করে সাজানো। সব কিছু এত পরিষ্কার, এত পলিশড। নিজেকে কেমন জানি বেমানান মনে হয়। ঐখানে নাস্তা করে হাঁটতে হাঁটতে আবার ফিরে এলাম JBR।

JBR মানে হচ্ছে Jumaria Beach Residence। এখানে অনেক গুলো বড় বড় বিল্ডিং এর ক্লাস্টার রয়েছে। বিল্ডিং গুলোর উপরে ক্যাফে, শপিং মল, পুল, জীম সবই রয়েছে। রয়েছে বাচ্চাদের খেলার জায়গা, পার্কের মত অনেকটা। সব কিছু এত সুন্দর করে সাজানো যা আমাদের দেশে চিন্তাও করতে পারি না।

শনিবার

দুপুরের দিকে ঘুম থেকে ফ্রেশ হয়ে রুম চেক আউট করলাম। ফিরে এলাম ৬৬ ফ্লোরের আগের হোস্টেলটিতে। এখানে সব কিছুই গোছানো, মানুষ গুলোও ফ্রেন্ডলি। বাকি কয়েক দিন এখানেই থাকব। চেকইন করে বের হলাম দুবাই ঘুরতে। বিগবাসে উঠলাম ঘুরার জন্য। আবার ও দুবাই শহরের এ মাথা থেকে অন্য মাথা ঘুরা হয়ে গেলো। নামিয়ে দিল দুবাই মলের সামনে। রাতেও ট্যুর রয়েছে বিগবাসের। রাতের ট্যুরের জন্য উঠে পড়লাম অন্য বাসে।

৬৬ তলা থেকে এই ভিউ দেখা যায়

দিনের থেকেও রাতে দুবাই বেশি সুন্দর। সব কিছু অনেক সুন্দর লাইটিং করা। এছাড়া দিনে প্রচুর গরম। রাতে গরম হলেও সহনীয়। দিনে বাসে করে দেখলাম দুবাই দিনে কেমন। এখন দেখছি রাতে কেমন। বুর্জ আল আরব, ম্যারিনা, পাম জুমারিয়া সব ঘুরিয়ে আবার পুরাতন দুবাই এর দিকে নিয়ে গেলো। এরপর ওয়াফিতে থামাল কিছুক্ষণ। ইজিপ্ট এর উপর একটা শো দেখলাম। এরপর আবার রওনা দিল দুবাই মলের দিকে।

দুবাই শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা খুবি ভালো। শহরের এক মাথা থেকে অন্য মাথায় ৩০ মিনিটে পৌঁছানো সম্ভব। আমি না জেনে ৫ দিনের বিগ বাসের টিকেট কেটেছি। দুইদিন উঠেই বিরক্ত হয়ে গিয়েছি। একই জায়গা বার বার দেখতে দেখতে। আর উঠছি না বিগ বাসে। যদিও বিগ বাসের সুবিধা দারুণ। বাসে ওয়াইফাই রয়েছে, খাওয়ার জন্য পানি রয়েছে যেটা এই গরমে খুবি দরকারি। আর রয়েছে ফ্রেন্ডলি স্টাফ। কোন কিছু সম্পর্কে জানতে চাইলে খুব সুন্দর করে জানিয়ে দেয়।

দুবাই মলে নেমে আমি খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। ততক্ষণে রাত বারোটা। মেট্রো বন্ধ হয়ে গিয়েছে। হোটেলে ফেরার এক মাত্র উপায় হচ্ছে ট্যাক্সি। দেখলাম স্কটল্যান্ডের দুইজন মহিলাও ম্যারিনার দিকে আসবে। উনাদের জিজ্ঞেস করলাম ট্যাক্সি শেয়ার করা যাবে কিনা। উনারা বলল অবশ্যই। ট্যাক্সি করে পরে ম্যারিনাতে চলে এলাম। ট্যাক্সি ভাড়া বেশি আসেনি। প্রায় ৫০ দিরহামের মত। রাতে সব ফাঁকা থাকায় খুব সহজেই চলে আসতে পেরেছি।

রবিবার

সকালে উঠে নাস্তা করে আবার ঘুমালাম। দুপুরের দিকে ইমাম ভাই কল দিল রেডি হওয়ার জন্য। এক সাথে আটলান্টিস এ যাবে। আটলান্টিস দারুণ সব রেস্টুরেন্ট রয়েছে। আমরা গিয়ে বসলাম Bread Street Kitchen নামক একটি ব্রিটিশ রেস্টুরেন্টে।

ইমাম ভাই অর্ডার দিল সালাদ, আমি অর্ডার দিলাম স্টেক। স্টার্টার হিসেবে চিকেন উইংস। যতবার উনার সাথে বের হয়েছি, প্রতিদিনই উনি ট্রিট দিয়েছেন। আমরা খাওয়া দাওয়া করলাম, গল্প করলাম এরপর রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলাম। ঐখানেই ছিল ছিল Lost Chambers Aquarium। এটির টিকেট কেটে ঢুকলাম। এর আগে দুবাই মলের একুরিয়ামে গিয়েছিলাম। ঐটাতে অনেক ক্রাউড। এখানেরটা দারুণ। নিরবিলি। সত্যিকারের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার জন্য বসার জায়গা রয়েছে। অনেক প্রকারের মাছ। এতই সুন্দর যে ঐখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করবে। আমরা কিছুক্ষণ থেকে বের হলাম। ইমাম ভাই আমাকে আমার হোটেলের নিচে ড্রপ করে দিয়ে গেলো।

Jellyfish
আটলান্টিস একুরিয়াম

এরপর আর কি। কমন রুমে বসে বসে সিরিয়াল দেখলাম!

সোমবার

দুবাইতে বৃষ্টি না হলেও ঝড় হয়। যাকে বলা যায় বালি বৃষ্টি। সব কিছু অন্ধকার হয়ে যায়। আজ দেখলাম ঝড় হচ্ছে। বাহিরে সব কিছু ঝাপসা। আমাদের দেশে মেঘ হলে সাধারণত ঠাণ্ডা লাগে। কিন্তু এখানে ঝড় হলেও গরমের কমতি নেই।

নতুন কোন কিছুতে অভ্যস্ত হওয়ার পর আকর্ষন কমে আসে। এ কয়েক দিন দুবাই থেকে সব কিছুতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। দুবাই ম্যারিনা এরিয়াটা অনেক সুন্দর একটা এরিয়া। এ কয়েক দিন এই এরিয়াতে ঘুরতে ঘুরতে স্বাভাবিক লাগতে শুরু করল। বিকেলের দিলে হাঁটতে বের হলাম। বোটে উঠলাম। গত কয়েক দিন ধরে একই রূপ দেখছি। কেউ ছবি তুলছে। কেউ বসে আছে। কেউ জগিং করছে। কেউ সাইক্লিং করছে। কেউ নিজের বাচ্চাদের নিয়ে খেলা করছে।

ম্যারিনা মলে গিয়ে নাস্তা করলাম। এরপর কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে রুমে ফিরে এলাম। বাড়ি যাওয়ার সময় হয়েছে। ঘুরতে আসলে যে জিনিস গুলো সবচেয়ে বেশি মিস করি, সেগুলো হচ্ছে নিজের বেড, নিজের ডেস্ক, নিজের বাথরুম এসব। যত ভালো রুমেই থাকি না কেন, নিজের রুমের মত হয় না কিছুই। ৬৬ তলা উপর থেকে পাম জুমেইরার কি সুন্দর ভিউ দেখা যায়, দেখা যায় সমুদ্রের ভিউ, দেখা যায় স্কাইডাইভ করে প্যারাসুট দিয়ে ল্যান্ড করার সুন্দর দৃশ্য, দেখা যায় ছোট এক ধরণের গাড়ি আকাশে উড়ার দৃশ্য, এই জিনিস গুলোকে মিস করব বাড়ি গেলে।

এখানে সুন্দর ভাবে জীবনযাপন করার সব ব্যবস্থা রয়েছে। রয়েছে ঘুরাঘুরি করার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা। একটা আধুনিক শহর। সবাই নিজের মত করে ব্যস্ত। রয়েছে নানা দেশের নানান রঙের লোক। সত্যি কথা হচ্ছে সব কিছু পারফেক্ট হয়েও আপন মনে হয় না।

দিনে বেশি ঘুমানোর কারণে রাতে ঘুম আসে না। আমি বসে বসে সিরিয়াল দেখলাম। সিলিকন ভ্যালি এর পঞ্চম সিজনের সব গুলো এপিসোড শেষ করলাম। ছোট ছোট এপিসোড, অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলো। এরপর দেখা শুরু করলাম ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড এর দ্বিতীয় সিজন।

মঙ্গলবার – ১৬ই মে

আজ রাত ১০টায় ফ্লাইট। ঘুম থেকে উঠে কিছু নাস্তা করে নিলাম। রুম চেক আউট করেছি ১টার দিকে। এরপর বের হলাম। রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের দিকে। ম্যারিনা এলাকায় ট্রাম রয়েছে। ট্রামে করে মেট্রো স্টেশনে গেলাম। ট্রাম এবং মেট্রো দুইটাই অটোমেটেড। কার্ড কেনার সিস্টেমও অটোমেটেড। মেট্রো স্টেশনে গিয়ে মেট্রোতে উঠে রওনা দিলাম এয়ারপোর্টের দিকে। অনেক সময় বাকি ফ্লাইটের। স্টারবাক্সে বসে কফি খেলাম। ল্যাপটপ খুলে এটা সেটা করে সময় পার করলাম। অনেক গরম, তা না হলে হয়তো এদিক সেদিক ঘুরে দেখা যেতো। সেই সুযোগ নেই।

বোর্ডিং পাস নেওয়ার সময় হলে বোর্ডিং পাস নিয়ে বোর্ডিং গেটের দিকে গেলাম। দুবাই এয়ারপোর্ট অনেক বড়। এক টার্মিনাল থেকে আরেক টার্মিনালে যাওয়ার জন্য অটোমেটেড ট্রেন রয়েছে। ওয়েটিং এরিয়াতে এসে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। এরপর বোর্ডিং এর সময় হলে প্লেনে উঠে পড়লাম। জেট এয়ার, এবারও কানেক্টিং ফ্লাইট। এবার হচ্ছে মুম্বাই হয়ে।

প্রায় তিন ঘণ্টার ফ্লাইট। লোকাল সময় রাত তিনটার দিকে মুম্বাই এয়ারপোর্টে নামলাম। মুম্বাই থেকে ঢাকার ফ্লাইট হচ্ছে সকাল ৮টার দিকে। কফি খেতে খেতে অপেক্ষা করলাম। চারপাশ ঘুরে দেখলাম। মুম্বাই এয়ারপোর্টও অনেক বিশাল। এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতেই ৩০ মিনিট লাগার কথা! সকালে আমার ঘুম আসে। এই সকালে জেগে থাকা কষ্টের। ঘুম যেন না আসে, তাই কিছুক্ষণ বসে কিছুক্ষণ হেঁটে কাটিয়ে দিলাম। সময় হলে প্লেনে উঠি এবং প্রায় সাড়ে এগারোটার দিকে ঢাকা এসে ল্যান্ড করি।

দুবাই শহর অনেক সুন্দর একটি শহর। সবই কৃত্তিম, তারপর ও সুন্দর। ঘুরার মত অনেক কিছুই রয়েছে। আমি এতদিন থাকা সত্ত্বেও অনেক জায়গায়তেই ঘুরতে যাইনি। এর একটা প্রধান কারণ হচ্ছে গরম। বাহিরে বের হতে ইচ্ছে করত না। যদিও সব গুলো ট্রানসপোর্টেই এয়ারকন্ডিশন রয়েছে। তারপরও যতটুকু সময় বাহিরে থাকতে হত, ততক্ষণ গরম লাগত। এখন যদিও গরম কম, সামনে আরো বেশি গরম লাগবে। দুবাই ঘুরার সবচেয়ে ভালো সময় হচ্ছে শীতকাল। যদিও তখন প্রচুর পর্যটক থাকবে। ভিড়ের মধ্যে সব কিছু তখন কেমন লাগবে জানা নেই।

থাকা খাওয়ার খরচ বলতে গেলে নিজের কাছে। আমি যে হোস্টেল গুলোতে ছিলাম সেগুলো প্রতি রাতের জন্য প্রায় ২০ ডলার করে দিতে হয়েছে। আমি সব গুলোই বুক করেছি এয়ারবিএনবি এর মাধ্যমে। সরাসরি বুক করলে হয়তো আরো কমে পাওয়া যাওয়ার কথা। হয়তো সিঙ্গেল রুম একটু কস্টলি হবে। কিন্তু ব্যাকপ্যাকারদের জন্য হোস্টেল গুলো দারুণ। খাওয়া খরচ ও নিজের কাছে। হোস্টেল হোক বা হোটেল সব জায়গায়ই রান্না করার ব্যবস্থা থাকে। সুপারশপ থেকে কিনে নিয়ে রান্না করে খেলে খরচ কম লাগার কথা। এছাড়া প্রচুর ফল পাওয়া যায় এখানে। দাম ও কম এবং ফ্রেস। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে একটু বেশি খরচ হতে পারে। চেইন ফুড স্টল গুলোতে খরচ কম যেমন ম্যাকডোনাল্ড, কেএফসি ইত্যাদি। এয়ার ফেয়ার রিটার্ণ টিকেট সাধারণত ৪০-৫০ হাজার টাকায় পাওয়া যাওয়ার কথা (ইকোনোমি)। কানেক্টিং ফ্লাইটে না যাওয়াই উত্তম। আমার ভালো লাগেনি। ডাইরেক্ট ফ্লাইটে একটু খরচ বেশি হলেও ডাইরেক্টই যাওয়া উত্তম হবে। ভিসা কিভাবে পাওয়া যায়, তা তো শুরুতেই বললাম। যদিও ভিসা ফী অনেক বেশি মনে হচ্ছে। তারপরও কিচ্ছু করার নেই! শহরের প্রায় কিছুই অটোমেটেড। তাই চলতে কোন অসুবিধে হওয়ার কথা না। ইচ্ছে থাকলে ঘুরে আসতে পারেন কৃত্তিম এই শহরে।

5 thoughts on “দুবাই ভ্রমণ – ডেজার্ট সাফারি এবং স্কাইডাইভ

  1. একটু পরেই পরীক্ষা। তারপরও ১ ঘণ্টা সময় দিয়ে অর্ধেকটা পড়ে ফেললাম। বাকিটা পরীক্ষা দিয়ে এসে শেষ করব। কিছু জায়গায় বানান ভুল আছে অল্প। ঠিক করে নিলে আরো ভাল হবে। ভাল থাকবেন।

Leave a Reply