শান্ত থাকা এবং সফলতা

যে কোন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা সফলতার জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা গুণ। আবার এই গুণ আয়ত্তে আনা অনেক কঠিন। সবাই পরে না, আর পারে না বলেই সবাই সফল ও হয় না।

আমরা অনেক কারণেই মানসিক ভাবে উত্তেজিত হই। যেমন ধরেন সকালে বুয়া ঘর ঝাড়ু দিতে এসে ফ্যানের সুইচ অফ করে যাওয়ার সময় অন করতে ভুলে গেলে। নিজেদের সম্পর্কে কেউ খারাপ মন্তব্য করলে। কেউ আমাদের কথা না শুনলে। ক্রাশ মেসেজ সিন করে ফেলে রাখলে। কোন ইচ্ছে বা লক্ষ্যে না পৌঁছাতে পারলে। কেউ আমাদের আত্মসন্মানে আগাত করলে এমনকি আমরা যখন অসহায় হয়ে যাই, তখনো মানসিক ভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠি।

আমরা মানুষ, অনুভূতিহীন রোবট নই বলেই আমরা ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে উত্তেজিত হয়ে পড়ি। উত্তেজিত হওয়া মনে হচ্ছে আপনি একজন স্বাভাবিক মানুষ। যদি উত্তেজিত না হতেন, তাহলেই অস্বাভাবিক হতো। কিন্তু উত্তেজিত হলে তা কতটুকু কন্ট্রোল করতে পারেন, তার উপর জীবনের অনেক কিছুই নির্ভর করে। মানসিক উত্তেজনা বা রাগ আমাদের শেখায় ঐ পরিস্থিতিতে কোন সমস্যা রয়েছে। সমস্যা না থাকলেও আমাদের মনের মধ্যে কৃত্তিম সমস্যা তৈরি করে দেয়। এ থেকে হতাশার সৃষ্টি হয়। আর হতাশ হয়ে গেলেই পরাজয় নিশ্চিত।

মানসিক উত্তেজনাকে পজেটিভ কোন কিছুতে ব্যবহার করতে পারলে তা খুবি ভালো একটা হাতিয়া হতে উঠতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমরা অনেকেই তা পারি না। রাগটাকে প্রকাশ করে ফেলি। প্রকাশ করে ফেললে আমাদের ব্রেইন শান্ত হয়। তখন ভালো কিছু করতে ব্রেইন আগের মত আগ্রহ পায় না। কিন্তু রাগ প্রকাশ না করে শান্ত থেকে সব কিছু বিবেচনা করে যদি আমরা কোন কাজ করতে পারি, তা খুব ভালো ফল দিতে পারে। তাই যে কোন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা খুবি দরকারি। কোন কিছু নিয়ে মানসিক ভাবে উত্তেজিত হয়ে উঠলে বড় বড় করে নিশ্বাস নিলে কিছুটা উত্তেজনা কমে।

বুয়া ফ্যানের সুইচ বন্ধ করে চলে গিয়েছে? যদি না নিজে উঠে ফ্যানের সুইচটা অন করতে না পারেন, তাহলে শুয়ে থেকে ঘুমটাকে ইনজয় করুন। কেউ খারাপ মন্তব্য করেছে? তা সঠিক হলে নিজেকে ইম্প্রুভ করে নিন। আর মিথ্যে হলে? ইগনোর করুন। যার পেছনে যত বেশি কথা বলা হয়, সে তত বেশি জনপ্রিয়। নিজের জনপ্রিয়তাকে উপভোগ করুন। ক্রাশ মেসেজ সিন করে ফেলে রেখেছে? সে হয়তো আপনাকে পছন্দই করে না। সাড়ে সাত বিলিয়ন মানুষ। এদের মধ্যে একজন আপনাকে পছন্দ নাই করতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। নতুন কাউকে খুঁজে নিন। অথবা এমন কিছু করার চেষ্টা করুন যেন তারাই আপনাকে মেসেজ দেয়… ইত্যাদি।

আমরা প্রায় সময় ধরে নেই যে আমাদের সাথে ভালো কিছু ঘটবে। কিন্তু বাস্তবতা আমাদের বুঝিয়ে দেয় বাস্তবতা কত খারাপ। তাই যদি শুরুতেই আমরা অনেক বেশি আশা না রেখে খারাপ কি কি ঘটতে পারে তা আগেই চিন্তা করে রাখতে পারি, আগের মত ততটা কষ্ট আমরা পাবো না। নিজেকে শান্ত রাখা খুবি সহজ হবে। যারা অপটিমিস্ট, তারা ভাবে যে কোন পরিস্থিতির আউটকাম পজেটিভই হবে। এ জন্যই সম্ভবত অপটিমিস্টরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায়। যেখানে পেসিমিস্টরা ভেবে নেয় সবচেয়ে খারাপটাই ঘটতে পারে। যেহেতু সবচেয়ে খারাপটাই ঘটতে পারে আগেই ওরা ধরে নেয়, নিজেকে সেভাবেই তৈরি করে নেয়। আর এতে কষ্টও কম পেয়ে থাকে। যদিও দুই ক্ষেত্রে দুইটা ভালো। অন্য কারো থেকে কিছু আশা করতে গেলে পেসিমিস্ট হওয়া উত্তম। নিজে কোন কাজ শুরু করতে গেলে বা কোন লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে কাজ করতে চাইলে অপটিমিস্ট হওয়া উত্তম।

স্টয়িক ফিলোসপি সম্পর্কে এর আগে লিখেছি। Marcus Aurelius নামক একজন বিখ্যাত স্টোয়িক ফিলোসপার বলেছেনঃ
“Begin each day by telling yourself: Today I shall be meeting with interference, ingratitude, insolence, disloyalty, ill-will, and selfishness – all of them due to the offenders’ ignorance of what is good or evil.”

প্রতিদিন সকালে এই ভেবে দিন শুরু করতে হবে যে, পতিপক্ষের ভালো মন্দ বুঝার অজ্ঞতার কারণে আজ আমার সাথে স্বার্থপরতা, অকৃতজ্ঞতা, কাজে বাধা, অবাধ্যতা, বিশ্বাসঘাতকতা, অশুভ দোয়া ইত্যাদির সব কিছু আমার সাথে ঘটতে পারে। পুরো কোটের লিঙ্ক। অন্যের থেকে আশা কম করল হতাশও কম হতে হয়। আর হতাশ কম হওয়া মানে মানসিক ভাবে উত্তেজিতও কম হতে হয়।

একদিন না একদিন আমরা তো মরেই যাবো তাই না? সময় গুলো কত লিমিটেড। সামান্য কিছু নিয়ে মন খারাপ করে এই সময় গুলো নষ্ট করার মানে হয়? হয় না। যা কিছু আমাদের কন্ট্রোলে নেই, তা নিয়ে রাগ বা মন খারাপ না করে যা কিছু আমরা কন্ট্রোল করতে পারি, তা নিয়েই তো দিনটি পার করতে পারি। আগামীকাল পর্যন্ত বেঁচে থাকব, এমন তো কোন গ্যারান্টি নেই। আছে? কিছুক্ষণ পরই যদি আপনি মারা যান, তাহলে আপনি কি এসব বিষয় নিয়ে রাগ বা মন খারাপ করে থাকতেন? ঐ পরিস্থিতি কি একটু অন্য ভাবে সামাল দিতেন না? আমরা হয়তো ধরেই নেই যে আবার হয়তো সময় পাবো ক্ষমা চেয়ে নেওয়ার বা যা খারাপ করি, তা ভালো করার। সত্যি কথা হচ্ছে নাও পেতে পারি। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে ঠিক ঐ ভাবে কাজ করা উচিত আমদের যেমন ভাবে আমরা কাজ করব মৃত্যুর আগের সময় গুলোতে।

নিজের ক্ষুদ্রতা নিয়ে চিন্তা করলে সব কিছু নিয়ে আর আমরা কমপ্লেইন ও করব না, মনও খারাপ করব না, মানসিক ভাবে উত্তেজনাও কম হবে। মহাবিশ্বের তুলনায় আমরা কত ক্ষুদ্র, একটু ধারণা করতে পারেন? আমরা কত ক্ষুদ্র, তা বুঝতে চাইলে এই ভিডিওটা দেখতে পারেন। আমরা কত কিছু নিয়ে মন খারাপ করি, অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করি, রাগান্বিত হই চিৎকার, চেঁচামেচি করি। যে বিষয়টা এখন খুবি গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, কিছুক্ষণ পর বা কয়েকদিন পরই তা গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। কিন্তু আমরা যে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি, তা তো সারা জীবনের জন্যই রয়ে যায় যার সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়, তার মনে। পৃথিবীর তুলনায় আমরা কত ক্ষুদ্র? একটা বালু কণার সমান, তাই না? আবার এই মহাবিশ্বের তুলনায় পৃথিবীটাও একটা বালু কণা বা তার থেকেও ছোট। এরপর ও কিসের এত অহংকার আমাদের? এই পৃথিবী থেকে আমরা কি বেঁচে ফিরতে পারব? পারব না। আমরা যে সকল সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি, অন্য সবাই হয়তো একই বা ভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে। সবাই আসলে আমরা একই পথের যাত্রী। সবার গন্তব্য মৃত্যু। আমরা যেমন অন্যের থেকে সহানুভূতি, সমবেদনা, সহমর্মিতা, নম্রতা, ভদ্রতা আশা করি, অন্যরাও ঠিক একই জিনিস আমাদের কাছে আশা করে। সহানুভূতি, সমবেদনা, সহমর্মিতা, নম্রতা, ভদ্রতা একটু খানি ভালোবাসা এসবের কারণেই তো আমরা হিউম্যান, তাই না? নিজেকে কন্ট্রোল করতে না পেরে আমরা ইনহিউম্যান হয়ে উঠছি না তো?

দেখে থাকবেন ছোট পোস্টের মানুষ গুলোকে একটু বেশি চেঁচামেচি করতে। যে যত সফল মানুষ, তারা তত কম চেঁচামেচি করে। প্রতিটা পরিস্থিতি নিয়ে একটু বেশি ভাবে। একটু বেশি শান্ত থাকে। সফলতার জন্য এটাই সবচেয়ে বেশি জরুরী। নিজেকে শান্ত রাখা। শান্ত থেকে যে কোন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। নিজের মস্তিষ্কটাকে কাজে লাগানো। তারা বুঝে মানসিক ভাবে উত্তেজিত হলে মানুষের বিচার বুদ্ধি লোপ পায়। আর যে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না, সে কোন পরিস্থিতি কন্ট্রোল করবে কিভাবে? নিজের লক্ষ্য সেট করুন। ঐ লক্ষ্য রিলেটেড যা কিছু আছে, তা ছাড়া বাকি সব কিছুই হচ্ছে নয়েজ। নয়েজের দিকে ফোকাস করে নিজেকে মানসিক ভাবে উত্তেজিত করে রাখবেন নাকি শান্ত থেকে নিজের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাবেন, তা আপনার ইচ্ছে। আর যার ইচ্ছে যত সুন্দর, সে তত মহান 🙂

One thought on “শান্ত থাকা এবং সফলতা

  1. ধন্যবাদ ভাই। অনেক সুন্দরভাবে গুছিয়ে লিখেছেন।

    আরো সামনেদিকে এগিয়ে যান। শুভ কামনা রইল।

Leave a Reply