ঢাকা থেকে শ্রীমঙ্গল বাইক ট্যুর

শুক্রবার সকালে ঘুম থেকে উঠার পর ইচ্ছে হলো কোথাও চলে যেতে। ব্যাগ গুছিয়ে বাইকটা নিয়ে রওনা দিলাম শ্রীমঙ্গলের দিকে। শ্রীমঙ্গল ঢাকা থেকে খুব একটা বেশি দূরে নয়। ১৮০ কিলোমিটারের মত দূরত্ব। গুগল ম্যাপ দেখাচ্ছিল ৪ ঘণ্টার মত লাগবে যেতে। আমি সকাল ৬টার দিকে সম্ভবত রওনা দেই। ঠিক মতই যাচ্ছিলাম। আবহাওয়া ও ভালো ছিল। নরসিংদী যাওয়ার পর গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো। তিতলি ইফেক্ট। কিছুক্ষণ পর দেখি অনেক বেশি বৃষ্টি। আমি একটা চায়ের দোকানে দাঁড়ালাম। ভাবলাম বর্ষা শেষ হয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পরই বৃষ্টি কমে যাবে। কিন্তু কমে নি। উল্টো বাড়তে লাগল।

চায়ের দোকানে চা অর্ডার দিয়ে খাচ্ছিলাম। সামনেই দেখলাম একটা এক্সিডেন্ট ঘটল। এক সাথে ৪টা প্রাইভেট কার। একটা একটার পেছনে মেরে দিল। মাঝের দুইটার সামনে এবং পেছনে, দুই দিকেই ভেঙ্গে গেলো। সমস্যা হচ্ছে অন্য আরেকটা প্রাইভেট সম্ভবত কোন ইনডিকেটর ছাড়াই ইউটার্ণ নিচ্ছিল। একটা পেছনে আরেকটা ছিল। বৃষ্টি হওয়ার কারণে ব্রেকও ইফেক্টীভ ভাবে করা যায় নি। রেজাল্ট হিসেবে এক্সিডেন্ট। গাড়ী হওয়াতে মানুষ গুলোর কিছু হয়নি। এই জিনিসটা বাইকের সাথে হলে ডেডলি এক্সিডেন্ট হতো।

এক ঘণ্টা পর ও বৃষ্টি কমার লক্ষণ দেখিনি। বাসায় ফিরে যাবো? নাকি রওনা দিব? ভাবতে ভাবতে রওনা দিলাম। বৃষ্টির মধ্যেই। পুরো রাস্তাই বলা যায় ভিজতে ভিজতে যেতে হয়েছে। পথে একটা হোটেলে দাঁড়িয়ে সিঙ্গারা খেলাম। জানি না শেষ কবে সিঙ্গারা খেয়েছি। এতদিন পর খাওয়ার পর ভালোই লেগেছে। যাওয়ার পথে ছোট বড় অনেক গুলো এক্সিডেন্ট দেখলাম। দেখলাম ট্রাক উল্টে পড়ে আছে রাস্তার পাশে। এই রোডটা দ্বিমুখী। বাস গুলো খুব স্পিডে চলে। খুব রিস্কি একটা রোড। ঢাকা সিলেট হাইওয়ে থেকে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার এক্সিট রোডটা অনেক বেশি সুন্দর। অনেক বেশি বাঁক। বাঁক ওয়ালা রোড গুলো রিস্কি হওয়া স্বত্বেও ড্রাইভ করতে ভালো লাগে। এছাড়া দুই পাশে রয়েছে চা এবং রাবার বাগান। খুব সুন্দর লাগে দেখতে।

আমি শ্রীমঙ্গল পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় একটা। শুক্রবার। একটা মসজিদে জুমার নামাজ পড়ে নিলাম। নামাজ শেষে রিসোর্ট খুঁজতে লাগলাম। কোথায় থাকা যায়। দুই তিনটা রিসোর্ট দেখার পর দেখলাম সব গুলোই বুকড। আমি চলে এলাম শহরে। হোটেল সুলতান নামে একটা হোটেলে উঠলাম। ওদের ঐখানেই রেস্টুরেন্ট ছিল। দুপুরের খাবার খেয়ে নিলাম। বাহিরে বৃষ্টি হওয়াতে আর বের হইনি। রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে নিলাম কিছুক্ষণ। বিকেলে বের হলাম। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করলাম। সন্ধ্যার পর বাকি সময় হোটেলেই কাটালাম।

পরের দিন সকালে উঠে নাস্তা করে নিলাম পাঁনসিতে। এরপর গেলাম সাত লেয়ারের চা খেতে। নীলকণ্ঠ নামক একটা দোকানে। গুগলে দেখলাম সকাল ৮টায় খোলে। ঐখানে গিয়ে জানতে পারলাম ১২টার পর থেকে পাওয়া যাবে। আমি ঘুরতে বের হলাম। রাস্তা যে দিকে নিয়ে যায়, ঐ দিকে যেতে থাকলাম। বাইক থাকাতে একটা সুবিধে। যেতে যেতে দেখি ফিনলে চা বাগানের ভেতর ঢুকলাম।  এক জায়গায় গার্ড। আমি জিজ্ঞেস করলাম ভেতরে যাওয়া যাবে কিনা। বলল কোথায় যাবো। আমি বললাম, এমনতেই। ঘুরতে বের হয়েছি। বলল যান, সমস্যা নেই। আমি চা বাগানের শেষ দেখার জন্য ড্রাইভ করা শুরু করেছি। যত দূর যাই, শেষ হয়না। প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়েছি। পাকা রাস্তা। দুই দিকে আবার কাঁচা রাস্তা বের হয়েছে। চা বাগানে যারা কাজ করে, তাদের ঘর বাড়ি রয়েছে। ফিনলে এর বিভিন্ন অফিস রয়েছে। যেতে যেতে দেখলাম একটা এয়ারপোর্ট পর্যন্ত রয়েছে। যদিও ঐটাতে এখন ঘাস জন্মে রয়েছে।

অনেক দূর গিয়ে যখন শেষ করতে পারলাম না, তখন ফিরে এলাম শ্রীমঙ্গল। অনেক সোজা রাস্তা। দুই পাশেই সুন্দর চা বাগান। কি যে ভালো লাগছিল ড্রাইভ করতে।

চা পাতা সংগ্রহ
রাবার বাগান
চা বাগান

আমি বলা যায় প্রতিদিন সকালে ঘুমাতে যাই। আজ ঘুম থেকে সকাল সকালই উঠেছি। হোটেলে ফিরে ভাবলাম আরেকটু ঘুমিয়ে নেই।

ঘুম থেকে উঠে আবার গেলাম সাত লেয়ারের চা খেতে। নীলকণ্ঠ চা কেবিন এ। এবার গিয়েও দেখি যিনি চা তৈরি করেন, উনি আসেননি এখনো। যদিও দোকান খুলেছে তখন। বলল আসতেছে। আমি একটা আইসক্রিম নিয়ে খেতে খেতে অপেক্ষা করতে লাগলাম। উনি আসল। দোকানকে প্রণাম করল। ধুপ জ্বালালো। এরপর অর্ডার দিলাম। দেখলাম ৮ লেয়ারের চা ও পাওয়া যায়। আমি ৮ লেয়ারের চা অর্ডার দিলাম। প্রায় ২০ মিনিট পর চা পেলাম। এটা চা হিসেবে খেতে গেলে ভালো লাগবে না। আট লেয়ারে আট রকম উপাদান। কিন্তু এক্সপেরিয়েন্স নেওয়ার জন্য খেতে গেলে ভাল লাগার কথা। জিনিসটা আসলে একটা আর্ট। সব গুলোই তরল। এরপর ও না মিশিয়ে সার্ভ করে। যদিও একটু নাড়া চাড়া করলেই মিশে যায়।

চা খেতে খেতে দেখলাম নওরিন আপু আমাকে মেসেজ দিল।উনিও শ্রীমঙ্গল। কয়েকটি পিক পাঠিয়ে বলল জায়গাটা আমার পছন্দ হবে। ঘুরতে যেতে। আর উনাদের সাথে লাঞ্চ করতে। আমার কোন প্ল্যান না থাকায় আমি চা খেয়ে চলে যাই। জায়গাটার নাম শান্তি বাড়ি। মেইন রোডে এসে জিজ্ঞেস করলাম শান্তি বাড়ি কই। আমাকে আঙ্গুল দিয়ে একটা ছোট্ট স্টিলের পুল দেখয়ে দিয়ে বলল ঐ দিকে। আমি বাইক নিয়ে রওনা দিলাম। ভাবলাম ঐ পাড়েই হয়তো শান্তি বাড়ি। ঐ পাড়ে গিয়ে দেখি লোকালদের ঘর। ওদেরকে জিজ্ঞেস করলাম শান্তিবাড়ি কোন দিকে। বলল একটু সামনে। কাঁচা রাস্তা। রাস্তা বললে ভুল হবে। হাঁটার মত অবস্থা। এর উপর বৃষ্টি হয়ে সব কাঁদা হয়ে রয়েছে। আমি আরেকটা বাড়ি গিয়ে উঠলাম। ওরা বলল একটু পরেই। বাইক নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আমার বাইকটা নিয়ে যাওয়া একটু কষ্টকর। এরপর ও বাইক নিয়েই রওনা দিলাম। পেয়ে গেলাম শান্তিবাড়ি।

শান্তিবাড়িতে আসলে একটা শান্তি ভাব আছে। ভেতরের দিকে এত সুন্দর একটা রিসোর্ট। সত্যিকারের একটা ইকো রিসোর্ট। রিসোর্টটের মালিক লিঙ্কন ভাই। উনি রিসোর্টের বিভিন্ন ঘর গুলো দেখালো। এক একটা এক এক রকম। একটাতে বসে আমরা গল্প করলাম। রিসোর্টের এদিক সেদিক হেঁটে দেখলাম। পুকুর রয়েছে একটা এখানে। পুকুর বলব কিনা জানি না। এটার পানি নাকি কখনো কমে না। মাটির নিচ থেকে সব সময় পানি উঠে।

রান্না বান্না যেখানে করে, সেখানে একটা কুয়া দেখলাম। ঐ কুয়াটা গভীর না। কিন্তু ঐটাও অটোমেটিক পানিতে ভর্তি থাকে সব সময়। পাহাড়ের পাদদেশে হওয়াতে এই সুবিধে। হিডেন ঝর্ণা!

কিছুক্ষণ পর দুপুরের খাবার পরিবেশন করল। একটা খোলামেলা জায়গায়। উনাদের ঐখানে কোন ফ্রিজ নেই। সব কিছুই নাকি ফ্রেশ। নিজেদের বাগানের শাঁক ভাজি এছাড় মাছ, মুরগি দিয়ে সুন্দর করেই দুপুরের খাবার খেলাম। অনেক ভাল রান্না। সাথে ভালো পরিবেশ।

শান্তি বাড়িতে

খাওয়া দাওয়ার পর উনারা ঘুরতে যাবে। আমিও বের হলাম উনাদের সাথে। আমার বাইকে উঠল ঐখানেরই একজন। শ্রীমঙ্গল বাড়ি।  প্রথমে এয়ারপোর্ট গেলাম আমরা। যেতে যেতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। এয়ারপোর্টের এখানে বাঁশ দেওয়া। উনি বাঁশটা সরিয়ে দেওয়ার পর বাইক নিয়ে এয়ারপোর্টে ঢুকে গেলাম। একেবারে শেষ মাথায় চলে গেলাম। ঘাস জন্মে থাকার কারণে পিচ্ছিল। বাইক স্পিডে চালানো যায়না। এরপর ও ভালো লাগল।

এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমরা চা বাগানের ভেতর দিয়ে আরো যেতে লাগলাম। শেষই হচ্ছে না চা বাগান। প্রায় ২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত গিয়েছি। এরপর শেষ হলো। যেতে যেতে সিঁন্দুরখান নামক একটা বাজার পড়ল। বাকিরা পেছনে রয়ে গিয়েছিল। সিঁন্দুরখান থেকে আমরা গরম মিষ্টি এবং পরোটা কিনে নিলাম। ফিরে এসে বাকিরা সহ একটা খাবারের দোকানে বসে পরোটা খেলাম। এরপর রওনা দিলাম শ্রীমঙ্গলের দিকে। পথে দেখলাম শেয়াল পার হচ্ছে। চা বাগানের ভেতর অনেক বন্য প্রাণী রয়েছে।

ফেরার পথে আমরা গেলাম মনিপুরী পল্লীতে। ঐখানে হাতের কাজ করা বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করে। জামা কাপড়, বিছানা চাঁদর সহ অনেক কিছুই। নওরিন আপু একটা বাড়িতে নিয়ে গেলো। ঐখানে গিয়ে দেখলাম তাঁত। তাঁত দিয়ে কিভাবে শাল তৈরি করা হয়, তা দেখালো আমাদের। রাত হওয়া সত্ত্বেও তাঁত বুনে দেখালো। এক দিনে অনেক গুলো এক্সপেরিয়েন্স হলো। এরপর উনারা চলে গেলো শান্তি বাড়ি। আমি চলে এলাম আমার হোটেলে।

পরের দিন ঘুম থেকে সকালে একবার উঠেছি। পরে ভাবলাম এত সকালে উঠে কি করব, একটু ঘুমিয়ে নেই। উঠলাম সাড়ে নয়টার দিকে। নাস্তা করে রওনা দিলাম ঢাকার উদ্দেশ্যে। গাড়ি গুলো কেমন বেপরোয়া ভাবে চলে। হানিফের একটা বাস বলা যায় চাপা দিচ্ছিল। আমি রোড ছেড়ে লেনে নেমে যাই। এরকম কয়েকবারই হয়েছে। বাইক নিজে যত সাবধানে চালাই না কেন, এরপর ও কেন জানি খুবি রিস্কি। নিজের ভুলের পাশা পাশি অন্যের ভুলের জন্যও এক্সিডেন্ট হয়। কয়েক দিন আগে বাইক নিয়ে ঘুরতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করি। হাতের ব্যথা এখনো ভালো হয়নি। এরপরও কেন জানি বাইক নিয়েই বের হয়েছি। শুকরিয়া আল্লাহর কাছে যে ঠিক মত বাসায় পৌঁছাতে পেরেছি। ফেরার পথে আর বৃষ্টি হয়নি। উল্টো আকাশটা এত সুন্দর ছিল। মেঘ আর নীল রঙের আকাশ। খুব ভালো লাগছিল। ঢাকা থেকে গিয়েছি বৃষ্টি নিয়ে। ঢাকা ফিরেছি রোদ নিয়ে। খারাপ নাহ!

ফেরার পথে
ফেরার পথে

Leave a Reply