কুমিল্লায় একদিন

দেশের দক্ষিণ অঞ্চলের কোথাও ঘুরাঘুরির জন্য যেতে সাধারণত কুমিল্লার উপর দিয়ে যাই। এত সব সুন্দর যায়গা ঘুরতে গিয়েছি এই কুমিল্লার উপর দিয়ে। অনেকবারই ইচ্ছে হয়েছে কুমিল্লা  ঘুরে দেখার। কিন্তু হয়ে উঠেনি। এত বছর ধরে এতবার আসা যাওয়া করেছি, একবারও  কুমিল্লার সুন্দর যায়গা গুলো দেখা হয়নি। অনেকটা রবীন্দ্রনাথের কবিতার মতঃ

বহু দিন ধ’রে বহু ক্রোশ দূরে
বহু ব্যয় করি বহু দেশ ঘুরে
দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা,
দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু।
দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া
ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া
একটি ধানের শিষের উপরে
একটি শিশিরবিন্দু।

কুমিল্লা ঘুরার মত অনেক কিছুই আছে। ঢাকা থেকে যেহেতু কাছে, তাই আমরা একটা ডে ট্যুরের প্ল্যান করেছি। আমরা যারা ফ্রিল্যান্সিং করি, তাদের কয়েকজন মিলে সেলফ ড্রাইভ করে যাওয়ার প্ল্যান করি। প্ল্যান হয় শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে বের হয়ে সারাদিন ঘুরাঘুরি করে সন্ধ্যার পর ফিরে আসব। কি কি ঘুরা যায়, তার জন্য বিল্লাহ মামুন ভাই এবং মাসুম বিল্লাহ ভাইদের থেকে পরামর্শ নেই।

শুক্রবার সকালে বের হই। আমি এবং নাঈমা, উজ্জ্বল ভাই ও উনার ওয়াইফ, অন্তু ভাই বসুন্ধরা থেকে। উত্তরা থেকে তারেক ভাই, কাওলা থেকে কাওসার ভাই, মিরপুর থেকে রাজীব ভাই, ধানমন্ডি থেকে জুয়েল ভাই। ড্রাইভ করি আমি, অন্তু ভাই এবং উজ্জ্বল ভাই। উত্তরা এবং কাওলা থেকে তারেক ভাই এবং কাওসার ভাইকে পিক করার দ্বায়িত্ব পড়ে আমার উপর। উজ্জ্বল ভাই মিরপুর থেকে রাজীব ভাইকে পিক করে। অন্তু ভাই পিক করে জুয়েল ভাইকে ধানমন্ডি থেকে। এরপর আমরা কার্জন হলের সামনে একত্রিত হয়ে কুমিল্লার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। প্রায় সাতটা বেজে যায় কার্জন হলের সামনে থেকে রওনা দিতে।

শুক্রবার, তার উপর সকাল সকাল। ভেবেছি কোন জ্যাম হবে না। শহরে কোন জ্যাম না হলেও হাইওয়েতে প্রচুর জ্যাম ছিল। বুঝতেই পারিনি এত জ্যাম হবে। রাস্তা যেন এগুতেই চায় না। দাউদকান্দি পার হতে হতে প্রায় সাড়ে দশটা বেজে গিয়েছিল। ঐখানে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে বসে সকালের নাস্তা করি আমরা। গল্প করতে করতে খাওয়া দাওয়া শেষ করি। এরপর আবার রওনা দেই। গন্তব্য ছিল কুমিল্লার শালবন বিহার। ঐখানে পোঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় একটা বেজে গিয়েছিল। দুই ঘণ্টার রাস্তা পৌঁছাতে আমাদের পাঁচ ঘণ্টা লেগেছে। এত বেশি ট্রাফিক ছিল রাস্তায়। জায়গায় জায়গায় জ্যাম ছিল। তার উপর ট্রাক গুলো পাশা পাশী চলে প্রাইভেট গুলোকে যেতেই দেয় না। আস্তে আস্তে ওদের পেছন পেছন যেতে হয়। একটু সুযোগ পেয়ে যদি না একবার বের হতে পারি, সামনে গিয়ে দেখি আবার দুইটা। কি যে বিরক্ত লাগে এখন ঢাকা চট্রগ্রাম হাইওয়েতে ড্রাইভ করতে।

কচিকাঁচার দল!
কচিকাঁচার দল!

শালবন বিহারের ঐখানে বিশাল পার্কিং স্পেস। দেখলাম অনেক গুলো স্কুল কলেজ থেকে ঐখানে শিক্ষা সফরে এসেছে। এমনকি ঢাকা থেকেও যেতে দেখেছি। শুক্রবার। জুমার নামাজের সময়। পাশেই একটা মসজিদ ছিল। আমরা সবাই নামাজ পড়ে নিলাম মসজিদে গিয়ে। আকাশে হালকা মেঘলা থাকায় গরম কমই পড়ছিল। এরপরও ডাব দেখে পিপাসা যেন বেড়ে গেলো আমাদের। সবাই মিলে ডাব খেয়ে নিলাম। এরপর প্রবেশ করলাম শালবন বিহারে। এন্ট্রি ফি ২০ টাকা। যায়গাটার একটা ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতত্ব ভ্যালু তো আছেই, তার উপর অনেক সুন্দর। যারা বেহুলার বাসর দেখেছেন, তাদের কাছে সিমিলার কিছু মনে হবে। সব কিছু অনেক সুন্দর ভাবে সাজানো। এই শালবন বিহারের আগের নাম ছিল শালবন রাজার বাড়ি যেটার সত্যিকারের নাম ছিল ভবদেব মহাবিহার। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে দেখলাম, ছবি তুললাম। খনন করার ফলে অনেক গুলো ভবন উন্মেচিত হয়েছে। মন্দির, বৌদ্ধ বিহার সহ অনেক কিছুই ছিল। প্রশ্ন হচ্ছে এগুলো মাটির নিচে গেলো কিভাবে?

শালবন বিহার
শালবন বিহার
শালবন বিহার

নেন, ইতিহাস পড়েন!

ঐখানে একটা কুপ ছিল। কুপের কাছে গিয়ে দেখি পানি নেই। অনেক গুলো বোতল পড়ে আছে কুপের নিচে। মজা করে আমি একটু জোরে বললাম এই তো একটা কুপ! সবাই ভেবেছে ইন্টারেস্টিং কিছু। সবাই জড়ো হয়ে গেলো। এসে দেখল খালি কুপ! ছোট খাটো একটা প্র্যাঙ্ক হয়ে গেলো!

বৌদ্ধ বিহার থেকে বের হয়ে আমাদের উদ্দেশ্য ছিল দুপুরের খাওয়া দাওয়া করা। আসে পাশে অনেক গুলো খাবারের দোকান ছিল। খেতে ইচ্ছে করছিল না ঐ গুলোতে। হাইওয়ে রেস্টুরেন্ট গুলোতে গিয়ে আবার আসতে অনেক সময় লেগে যাবে। পরবর্তী গন্ত্যব্য ছিল ম্যাজিক প্যারাডাইস। তো ওদের ফোন করে জিজ্ঞেস করলাম খাবার আছে কিনা। বলল আছে। খুশি মনে চলে গেলাম।

ম্যাজিক প্যারাডাইসের প্রথম ইম্প্রেশন ভালো ছিল না। প্রথমে ভেবেছি বাচ্চাদের জন্য কিছু একটা, আমরা বুড়ারা গিয়ে কি করব। এন্ট্রি ফি জন প্রতি ২০০টাকা। ২০০টাকা দিয়ে ঢুকব কিনা, ভাবতেছিলাম। আবার খাবার খেতে হলেও ভেতরে ঢুকতে হবে। রেস্টুরেন্ট নাকি ভেতরের দিকে। ঢুকলাম সবাই মিলে। ঢুকে ভালোই লাগল। সুন্দর একটা যায়গা। সবাই বলল আগে খাওয়া। পরে ঘুরে দেখা। খিদা ভালোই লেগেছে আমাদের সবার।

ম্যাজিক প্যারাডাইসে আমরা

রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করলাম। খাবার থাকলেও প্যাকেজ করা খাবার। চিকেন বিরিয়ানি, ২৪০ টাকা। আর কোন অপশন নেই। সাথে একটা পানি এবং একটা পেপসি। খাবার খারাপ বলা যাবে না। কিন্তু আমরা আসলে অন্য কিছু আশা করছিলাম। যেমন ভাত, তরকারি টাইপের কিছু। তাই কিছুটা খারাপ লেগেছে।

খাওয়া দাওয়া করে আমরা এবার ম্যাজিক প্যারাডাইস ঘুরে দেখলাম। ঐখানে ডাইনোসর ওয়ার্ল্ড একটা আছে। অনেক গুলো ডাইনোসর রয়েছে বিশাল সাইজের। যেগুলো হালকা মুভ করে, আবার সাউন্ড সিস্টেমও আছে যেখান থেকে সাউন্ড বের হয়। ইন্টারেস্টিং লাগল।

বাম্পিং কার রাইড আছে এখানে।  আটজন এক সাথে বাম্পিং কার চালাতে পারে। আমরা সবাই ইন্টারেস্টেড। টিকেট কেটে নিলাম। এরপর এই বাম্পিং কার দিয়ে একজন আরেকজনকে যত স্পিডে পারা যায়, ধাক্কা দিতে লাগলাম। মাত্র তিন মিনিট সময় দেয়। ১০০টাকা টিকেট। এত বেশি মজা লাগল যে আমরা আবারও নিলাম।

ঐখানে বড় সড় নাগরদোলা ছিল একটা। অনেকটা সিঙ্গাপুর ফ্লায়ারের বা লন্ডন আই এর মত। আমরা উঠলাম সেখানে। খুব একটা থ্রিল ছিল না যদিও। খারাপও লাগেনি। কি করব ভাবতে ভাবতে সবাই বলল আবারও বাম্পিং কার চালাবে। বাম্পিং কারে আমরা এতই মজা পেয়েছি যে টোটাল ৫বার টিকেট কেটেছি।

ম্যাজিক প্যারাডাইস আসলে বাচ্চাদের জন্যই। তবে ঐখানে গিয়ে আমরা নিজেরাও বাচ্চা হয়ে গিয়েছি। ফ্লাইং জেট তো পুরোটাই বাচ্চাদের। দেখলাম বাচ্চাদের সাথে তাদের বাবা মারাও উঠে। আমরাও উঠলাম। সবাই মিলে উঠায় ভালোই লেগেছে আমাদের কাছে। এভাবে করতে করতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো। ঐখানে ওয়াটার পার্কও আছে। জুয়েল ভাইরা ঐখানে গিয়ে কয়েকটা রাইড দিল। আরো ছোট বড় কিছু রাইড আছে। যে কোন বয়সের মানুষেরই ভালো লাগবে। কিছুটা ফয়েজ লেক বা ফ্যান্টাসি কিংডমের মত।

ফ্লাইং জেটে এক বুড়াবাবু!
ফ্লাইং জেটে এক বুড়াবাবু!

ভেতরের দিক থেকে ম্যাজিক প্যারাডাইস
ভেতরের দিক থেকে ম্যাজিক প্যারাডাইস

মাসুম বিল্লাহ ভাই দাওয়াত দিল উনার অফিস জায়ান্ট মার্কেটার্সে যাওয়ার জন্য। আমরা সবাই মিলে উনার অফিসে গেলাম। আড্ডা দিলাম। উনি অনেক কিছু খাওয়ালো। যেমন ক্যাসোনাট সালাদ, চিকেন গ্রিল, নান রুটি, কফি, কুমিল্লার আসল মাতৃ ভাণ্ডারের রসমালাই ইত্যাদি। আমরা সবাই বাসায় রসমালাই আনব বললাম। হিসেব করে দেখলাম আমাদের প্রায় ২৩ কেজি লাগবে। এত গুলো রসমালাই সাধারণত ওরা দেয় না। একজন সর্বোচ্চ ৩ কেজি নিতে পারে সম্ভবত। তো স্পেশাল রিকোয়েস্ট করে আমাদের জন্য ম্যানেজ করেছে। খাওয়া দাওয়া করে, আড্ডা দিয়ে আমরা সাড়ে দশটার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই। যাওয়ার সময় মত অত জ্যাম ছিল না যদিও। প্রায় দুইটার দিকে বাসায় পৌঁছাই। এত জ্যাম ঠেলে গিয়েও খুব মজা লেগেছে আমাদের।

জায়ান্ট মার্কেটার্সে আমরা
জায়ান্ট মার্কেটার্সে আমরা

আমাদের ইচ্ছে ছিল লালমাই পাহাড় এবং ধর্মসাগর ঘুরে দেখার। কিন্তু সকালের জ্যামের কারণে অনেক সময় নষ্ট হওয়াতে এই দুইটা যায়গা ঘুরে দেখা হয়নি। তোলা থাকল ভবিষ্যৎ এর জন্য। ইনশাহ আল্লাহ আবার কখনো গিয়ে ঘুরে আসব।

Leave a Reply