কক্সবাজারে ঘুরাঘুরি এবং প্যারাসেইলিং

আমার পছন্দের একটা জায়গা হচ্ছে এই কক্সবাজার। যতবারই আসি না কেন, আমার কাছে খারাপ লাগবে না। সমুদ্রের কাছে গেলে বুঝা যায় নিজের ক্ষুদ্রতা। বুঝা যায় সমুদ্রের বিশালতা। বিশাল সমুদ্র দেখতে ভালো লাগে, তাই ছুটে যাওয়া।  সাথে এবার আবার প্যারাসেইলিং করার সুযোগ হলো।

আমি ছিলাম চট্রগ্রাম। বলা যায় কোন কারণ ছাড়াই এসেছি। নেই কাজ খই ভাঁজ টাইপ। চট্রগ্রাম সাগরিকায় কাজিনদের বাসায় উঠেছি। সাগরিকার পাসেই একটা বীচ আছে, কাট্রলি বীচ নামে। অনেকে আবার জেলে পাড়াও বলে। ওদের বাসায় আসলে এই বীচেও একবার ঘুরে আসি। বীচটা অন্যরকম সুন্দর। ভালো লাগে। মেঘলা আবহাওয়া থাকায় দুপুরে গিয়ে ঘুরে এসেছি। এখানে মাছ ধরার অনেক নোকা দেখা যাবে। আবার দূরে দেখা যাবে অনেক জাহাজ।

কাট্রলি বীচ বা জেলে পাড়া

সন্ধ্যার সময় গিয়েছি চট্রগ্রাম শিল্পকলায়। ঐখানে হেলাল হেজাজী ভাই ও আসিফ ভাই দের সাথে দেখা হলো। এরপর বাসায় এসে ঘুম। প্ল্যান করলাম পরের দিন কক্সবাজার যাবো। পারলে সেন্টমার্টিনও।

সকাল ৬টার দিকে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নিলাম। কক্সবাজারের দিকে রওনা দিলাম। সাথে ছিল কাজিন সুহৃদ। বাস অনেক সময় নিল কক্সবাজার আসতে। প্রায় একটা বেজে গেলো। আমরা কোন হোটেল বুক করে আসি নাই। কক্সবাজার নেমে শাকিল ভাইকে কল দিলাম। ভাই বলল হোটেল সী ওয়ার্ল্ড এ যেতে। এখানের ম্যানেজারের শাকিল ভাই এর পরিচিত। ডিসকাউণ্টের ব্যবস্তা করে দিলেন উনি। এখানে এসে একটা রুম নিয়ে উঠে পড়লাম। ব্যাগ রেখে আমরা চলে গেলাম বীচে।

বন্ধ থাকায় অনেক পর্যটক কক্সবাজার এসেছে। মনে হবে পানি থেকে মানুষ বেশি। বীচে অনেকক্ষণ পানিতে ঢেউ এর সাথে যুদ্ধ করলাম। আমরা একপাশ দিয়ে নেমেছি, উঠলাম অন্য পাশ দিয়ে। ঢেউ একদিকে নিয়ে যায়। পানিতে নেমে গোসল করতে কি যে ভালো লাগে। একটা কারণ হচ্ছে ছোটবেলা গ্রামে কাটানো। ঐ সময় পুকুরে গোসল করতে কি যে ভালো লাগত। পানিতে নামলে কয়েক ঘণ্টা পানিতে থাকতাম। শহরে এই সুযোগ পাওয়া যায় না। বিভিন্ন রিসোর্টে গেলে সুইমিং পুলে গোসল করা যায়, কিন্তু পুকুরের মজা তো আর সুইমিং পুলে পাওয়া যায় না। সাগর হলে ভিন্ন কথা। সাগরে আসলে তো পুকুরে গোসল করার আনন্দকেও ছাড়িয়ে যায়। ঢেউ আসলে কখনো ঢেউ এর সাথে ভেসে যাওয়া, কখনো ঢেউ মাথার উপর দিয়ে চলে যাওয়া, কখনো হাবুঢুবু খাওয়া, এগুলো অন্য কোথাও উপভোগ করা যায় না।

প্রচুর পর্যটক

 

ঢেউ এর সাথে মজা করা 🙂

সমুদ্র থেকে হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। এরপর বের হলাম দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য। যদিও ইতিমধ্যে বিকেলে হয়ে গিয়েছে। সাগর পাড় এসে মাছ খেতে হয়। রূপচাঁদা মাছ দিয়ে খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর চলে গেলাম হিমছড়ির দিকে। বিকেলে হিমছড়ি থেকে সন্ধ্যার দিকে ফিরে এলাম আবার কলাতলীর দিকে। বার-বি-কিউ খাওয়ার উৎকৃষ্ট সময়। বার-বি-কিউ খেয়ে চলে গেলাম সুগন্ধা পয়েন্টে। সন্ধ্যার পর দুই ঘণ্টা মত বীচে বসে ছিলাম। এরপর হোটেলে এসেই ঘুম।

হিমছড়িতে সূর্যাস্ত উপভোগ

পরের দিন সকালে ঘুম ভেঙ্গেছে আটটার দিকে। ফ্রেস হয়ে নাস্তা করতে যাবো, তখনি শাকিল ভাই আসল। আমরা সী ওয়ার্ল্ড এর রেস্টুরেন্টে বসলাম। হোটেল রিসার্ভেশন এর সময় আমরা খেলা করিনি যে ব্রেকফাস্ট কমপ্লিমেন্টারি। শাকিল ভাই বলল। শাকিল ভাই এর সাথে কথা বলতে বলতে নাস্তা করে নিলাম। এরপর উনি চলে গেলো। আমরা গেলাম টিকেট কিনতে। আমাদের সেন্ট মার্টিন যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু জানলাম জাহাজ এখনো সেন্ট মার্টিন রুটে চলাচল করে না। তাই কক্সবাজার থেকে ব্যাক করব ভেবেছি। কিন্তু ঢাকা ফেরার টিকেট নেই, থাকলেও পেছনের দিকে বা ভালো কোন সার্ভিস নেই। কি আর করা, গ্রীনলাইন থেকে পরের দিনের টিকেট কেটে রাখলাম।

নাঈম সিদ্ধিকি আবির এবং সাইফ উল্লাহ আমাকে কল দিচ্ছিল। উনারা হোটেলের লবিতে অপেক্ষা করছিল, তাই হোটেলে ফিরেছি। উনারা কক্সবাজারের। মোবাইল অ্যাপ ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করে। এরপর কিছুক্ষণ উনাদের সাথে কথা বললাম। এরপর ড্রেস চেঞ্জ করে রওনা দিলাম সৈকতের দিকে। আবার সমুদ্রের পানিতে নামার জন্য। সাথে উনারাও ছিল।

সৈকত থেকে রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। দুপুরের খাবার খেতে হবে। আমরা রেস্টুরেন্টে গিয়ে আবার ও রূপচাঁদা মাছ অর্ডার দিলাম। গতকালে খেতে দারুণ লাগার কারণে আবার ও খেতে ইচ্ছে করল। খেয়ে আবার রওনা দিলাম হিমছড়ির পথে। প্যারাসেইলিং করার জন্য।

প্যারাসেইলিং করার জন্য টিকেট কেটে নিলাম। ১৫০০ টাকা করে টিকেট। কিছুক্ষণ পর জানতে পারলাম ঢেউ বেড়ে গিয়েছে, এখন প্যারাসেইলিং করা যাবে না। বলল ওদের আরেকটা পয়েন্ট আছে, ঐখানে চলে যেতে। কাকড়া বীচ বলে ঐটাকে। পরে ঐখানে গেলাম। সূর্য ডুবি ডুবি করছে। দারুণ পরিবেশ। প্যারাসেইলিং করার জন্য রেডি হলাম।

দড়ির সাথে প্যারাসুট বেঁধে দিল আর দড়ি একটা স্পীড বোর্ডের পেছনে বাঁধা। স্পীড বোর্ড সামনে যাওয়ার সাথে সাথে আমি আস্তে আস্তে উপড়ে উঠতে লাগলাম। কোন ব্যথা নেই, কিছুই নেই। উপরে উঠার চারদিক কি সুন্দর দেখা যাচ্ছিল। পৃথিবীটা তখন সত্যিকারের গোলাকাল মনে হচ্ছিল। পাখির মত উড়ার একটা অনুভূতি। মাত্র ৪ মিনিটের মত উপরে ছিলাম। এরপর আস্তে আস্তে আবার নেমে এলাম। শুকরিয়া আল্লাহর কাছে, কোন সমস্যা ছাড়াই।

চলো বহুদূর
প্যারাসেইলিং – like a bird, in the sky

 

ততক্ষনে সূর্য ডুবে গিয়েছে। নামাজের জন্য মসজিদ খুঁজতে লাগলাম। কাঁকড়া বীচ থেকে ইনানির দিকে যাওয়ার পথে একটু সামনে গিয়েই পেয়ে গেলাম। নামাজ পড়ে আবার রওনা দিলাম কলাতলীর দিকে। আমি কক্সবাজার এত বার গিয়েছি যে সব রোড গুলো মুখস্ত হয়ে গিয়েছে। একটানা কয়েকদিন বন্ধ থাকার কারণে কক্সবাজার এতই মানুষ এসেছে যে হাঁটতে গেলে পরিচিত দুই একজনের সাথে দেখা হয়ে যায়। আশিকুর রহমান কল দিচ্ছিল দেখা করবে বলে। সুগন্ধা পয়েন্টে আসতে বললাম। দেখা হলো। কথা বলে বিদায় নিল। সন্ধ্যা হচ্ছে বার-বি-কিউ খাওয়ার জন্য সেরা সময়। একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে খেয়ে নিলাম।

কক্সবাজার যাবো, শুটকি কিনব না, এটা হয়? কিছু শুটকি কিনে রওনা দিলাম হোটেলের দিকে। সকালে উঠতে হবে, তাই একটু আগেই ঘুমুতে যাওয়া। ফেসবুকিং ও এটা সেটা করার কারণে যদিও ঘুম এসেছে সেই দেরি করেই।

সকাল 9.45 এ বাস ছাড়বে। সকালে ঘুম থেকে উঠে হোটেলের রেস্টুরেন্টে নাস্তা করে নিলাম। এরপর চেক আউট করে বের হয়ে পড়লাম বাস টার্মিনালের উদ্দেশ্যে। বাস সময় মতই ছাড়ল। কিন্তু কিছুদূর এসে ড্রাইভার জানালো যে ক্লাস ঠিক মত কাজ করছে না। রিপ্লেসমেন্ট বাস আসবে। বাস আসল, আমরা আবার রওনা দিলাম। নষ্ট হলো এক ঘন্টার মত। দিনের বেলায় গাড়ি অনেক আস্তে আস্তে চলে, কিছুক্ষন পর পরই ব্রেক করতে হয়। এতে চট্রগ্রাম আসতে আসতে বিকেল হয়ে গেলো। কুমিল্লা পৌছাতে পৌছাতে রাত ৮টার মত। কুমিল্লা থামাল হোটেল মাতৃ ভান্ডারে। এখানে গ্রীনলাইনের যাত্রীদের জন্য কমপ্লিমেন্টারি বুফ্যে খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। ফ্রি খাবার হিসেবে খারাপ না। খাওয়া দাওয়া করে আবার রওনা দিলাম। ঢাকা পৌছাতে পৌছাতে রাত ১১টা। বুঝলাম, ট্রাভেল করার জন্য রাতই সেরা।

রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন, কক্সবাজারে কোন সমস্যা হচ্ছে না তো? দুইদিন ছিলাম, কোন সমস্যা চোখে পড়েনি। সব কিছুই সুন্দর ভাবেই চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *