অরুণের ঈদ

গল্পটি গত বছর রোজার ঈদের আগে লিখছি প্রথম আলোর জন্য।

…….. 

জিন্নাত তুই এবার ঈদের জন্য কি কিনছিলি? জিজ্ঞেস করল রাব্বি। জিন্নাত বলল বসুন্দরা সিটিতে গেলাম, জিনিস পত্রের যে দাম কিছু কিনা যায় নাকি? দুইটা জিন্স, একটা টি সার্ট আর একটা পাঞ্জাবি কিনলাম। তুই কি কিনছস জিজ্ঞেস রাব্বি? আমি এখন ও কিনি নাই আজ কিনতে যাবে। দেখি হয়তো বসুন্দরা বা যমুনা ফিউচার পার্কে যেতে পারি। অরুণ তুমি কি কিনবে এবার? রাব্বি জিজ্ঞেস করল অরুণকে। অরুণের হার্টবিট একটু বেড়ে গেছে, চোখে ব্রু গুলো কুচকে গেছে। অন্য দিকে তাকিয়ে অরুণ বলল দেখা যাক এখন ও তো অনেক সময় আছে। অরুণ ভাবল এখানে থাকলে তার কষ্ট বাড়বে তাই সে আড্ডা থেকে উঠে আসল। পিছন থেকে রাব্বি আর জিন্নাত দুই জনেই বলে উঠল কিরে অরুণ চলে যাস কেন? অরুণ কাজ আছে বলে পিছনে না তাকিয়ে চলে সামনে পা বাড়াল।

অরুণ জানে এবার ও সে কিছু কিনতে পারবে না। তার অনেক দিনের ইচ্ছে দু হাত ভরে অনেক বাজার করবে। মায়ের জন্য একটা জামদানি শাড়ি, বাবার জন্য পাতলা দেখে পাঞ্জাবি, ছোট ভাই রনির জন্য সুন্দর দেখে একটা জিন্স আর টি সার্ট বোন হেনার জন্য সুন্দর একটা সবুজ রঙের থ্রী পিস, এক জোড়া নূপুর, একটি চিকন সোনার চেইন। কিন্তু কোন কিছুই কেনা হয় না।

তার নিজের ও সখ একটা কালো পাতলা পাঞ্জাবির। সখ সখই থেকে গেল। এসব ভেবে সে দীর্ঘ শ্বাস পেলল। এবার ও সে ভাবল নাহ! সামনের বছর সে অবশ্যই সবার জন্য ঈদের কেনা কাটা করে বাড়ি যাবে।

তার বন্ধুরা সবাই বলে অরুণ তুই ঈদে বাড়ি যাস না কেন? সে বলে আমার ভালো লাগে না, এটা সেটা বলে বন্ধুরের কে ফাঁকি দিয়ে আসছে। এবার ও সে বাড়ি না যেতে পারলে বেঁচে যায়। ছোট বেলাতেই ঢাকা চলে আসার কারনে বাড়িতে তার কোন বন্ধু বান্ধব তেমন নেই। সে জন্য ও বাড়িতে তার মন বেশি টিকে না। কিন্তু এবার তাকে যেতেই হবে। কারন তার বাবা বাড়িতে খুব অসুস্থ। দুই দিন আগে তাদের মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। কোন খবর ও নিতে পারে না সে। নতুন একটা মোবাইল কিনে নিতে হবে তার বাড়ির জন্য। কিন্তু টাকা কোথায়? সে যাদের কাজ করে তারা বলছে ঈদের আগে টাকা দিতে পারবে না। এ দিকে মেচের খরচ। ঐ বাড়ি যেতে ও অনেক টাকা। কিভাবে কি করবে সে ভেবে কুল কিনারা পায় না। বন্ধুদের কাছে চাইলে দিবে ওরা, কিন্তু তার খারাপ লাগে বন্ধুরের কাছ থেকে টাকা চাইতে। পরে আবার শোধ করার ও চিন্তা থেকে যায়। তাই কারো কাছে চাইতে ওপারে না সে।

আর মাত্র দুই দিন আছে ঈদের বাকি। আজ রওনা না দিলে আর টিকেট পাওয়া যাবে না। তার কাছে জন্য অল্প কিছু টাকা আছে মাত্র। যা দিয়ে শুধু মাত্র টিকেট কাটা যাবে। কোন কিছু কিনা যাবে না। কিন্তু তাদের বাড়ির জন্য মোবাইলটা জরুরি। বাড়িতে কি হয় না হয় কোন খবর নেওয়া যায় না। তার কাছে অল্প দামের নকিয়া একটা আছে। এটাই ভরসা। আসার সময় বাড়িতে এটা রেখে আসলেই চলবে। পরে ঢাকা এসে নতুন আরেকটা কিনে নিতে পারবে সে। এসব ভাবতে ভাবতে টিকেট কাটল।
সে অনেক দিন হল বাড়ি যায় না। সবাই এ জন্য কত কথা বলে অরুণ কে। কিন্তু অরুণের কি বাড়ি যেতে মন চায় না? চায় দুই এক দিন ছুটি পেলেই সে বাড়ি যেতে চায়। কিন্তু পকেটে তখন টাকা থাকে না।

গাড়িতে উঠে বাড়ির কথা ভাবতে লাগল। তার মায়ের কথা। বাড়ি গেলে মা কত প্রকারের পিঠা বানিয়ে খাওয়ায়। বাবা কত প্রকার ফলের গাছ লাগিয়েছে বাড়ির চার পাশে। সারা বছরই একটা না একটা ফল থাকেই তাদের বাড়িতে। পেয়ারা, বরই, কাঠাল, আম, জাম, লিচু, আঙ্গুর, কলা, পেপে, কমলা কি না আছে তাদের বাড়িতে। সব ফলই আছে তার বাবার জন্যই সব ফলের স্বাদ নিতে পারছে সে। সব কিছু চিন্তা করে তার মন চায় এখুনি বাড়িতে পৌছাতে। কিন্তু এখন ও অনেক সময় লাগবে বাড়িতে পৌছাতে। ভাবতে ভাবতে কখন তার ঘুম চলে আসল টের ও পেল না। গাড়ির হেল্পার সবাইকে নামার জন্য বলছে। চোখে ঘুম ঘুম নিয়ে সব দিকে তাকাল, দেখল স্টেশন এসে গেছে। সবাই একের পর এক নেমে যাচ্ছে। তার মন কেমন খারাপ করে উঠল। মনে হচ্ছে বাড়িতে না গেলেই সে বেঁচে যায়। আস্তে আস্তে তার ব্যাগ নিয়ে গাড়ি থেকে নামল। রিক্সা ঢেকে রিক্সায় উঠল।

সবার বাড়ি যাওয়ার আনন্দ সে দেখে। সবাই কি আনন্দে বাড়ি যাচ্ছে। আর তার মন খারাপ করে যেতে হচ্ছে। ঐ তো দেখা যাচ্ছে বাড়ির সামনের চা দোকান গুলো। যেখানে মুরুব্বিরা সবাই আগে বসে চা খেতে খেতে গল্প করত, আড্ডা দিত। কিন্তু একে একে অনেকেই চলে গেছে পৃথিবী ছেড়ে। এখন তার বয়সী কিছু ছেলে বসে আছে। মুরুব্বি বলতে কেউ নেই। যারা জীবিত আছে তারা হয় তো অন্য কোন কাজে ব্যস্ত রয়েছে। বা আগের মত বসে না দোকান গুলোতে।

বাড়ি সামনে এসে রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া চুকিয়ে ঘরের দিকে গেল। অনেক মানুষের ভীড়। নিশ্চই কিছু ঘটেছে। সবার মুখ কেমন ভার। অরুণের বুকে কেমন একটা কামড় দিয়ে উঠলে। পাশের বাড়ির রহিমা চাচি অরুণ কে দেখল। দেখেই বলে উঠল ঐ যে অরুণ এসে পড়ছে। সবাই তাকাল অরুণের দিকে। ভিতরের ঘর থেকে মায়ের কান্নার আওয়াজ শুনা যাচ্ছে। রহিমা চাচির কথা শুনে মা বের হয়ে এসেই অরুণকে জড়িয়ে কান্না শুরু করল। অরুণের বুঝতে বাকি থাকল না কি ঘটেছে…

  বানান ভুল গুলোর জন্য দুঃখিত


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *