রাগ এবং ক্ষমা

কি পরিমাণ রাগ আমরা এক একজন আমাদের অন্তরে পুষে রাখি। কি পরিমাণ প্রতিহিংসা পরায়ণ আমরা। নিজের কথাই বলছি। অনেক সময়ই ছোট খাটো বিষয় গুলো অনেক বড় করে দেখি। কেউ ছোট খাটো অন্যায় করলে সহজে ক্ষমা করে দিতে পারি না। অথচ কাউকে ক্ষমা করে দেওয়ার জন্য কি পুরষ্কার অপেক্ষা করছে, তা ভেবে দেখছি না।

আমরা কারো ছোট খাটো ভুল ক্ষমা করে দিতে পারি না, তাহলে আল্লাহ তায়লার কাছে শেষ বিচারের দিন কিভাবে ক্ষমা আসা করব? উনি যদি আমাদের সঠিক হিসেব নেয়, একটা মানুষও জান্নাতে পা দিতে পারবে না! চিন্তা করছেন আমরা প্রতিনিয়ত কত শত ভুল করে বেড়াই? উনি রাহমানের রাহিম, ক্ষমাশীল। আমাদের ক্ষমা করে দিবেন, সেই আশা রাখি। যদি ক্ষমা না করে, চিন্তা করেন আমাদের কি হবে।

কাউকে আমরা আল্লাহর জন্যই ক্ষমা করে দিব। আমরা জানি শেষ বিচার বলতে কিছু একটা আছে। একদিন সব কিছুর বিচার হবে। কাউকে ঠিক এই কারণেই ক্ষমা করে দিব, সে উচিলায় আল্লাহ তায়লা যেন আমাদের একই ভাবে ক্ষমা করে দেয়।
একটা হাদিস পড়ি এমনঃ

মহানবী (সাঃ) একদিন মসজিদে বসে আছেন। সাহাবীরা তাঁকে ঘিরে আছেন। এমন সময় মহানবী (সাঃ) বললেন, “এখন যিনি মসজিদে প্রবেশ করবেন, তিনি বেহেশতের অধিবাসী।” একথা শুনে উপস্থিত সব সাহাবী অধীর আগ্রহে তাকিয়ে রইলেন মসজিদের প্রবেশ মুখে। সবার মধ্যে জল্পনা কল্পনা চলছে, হয়তো হজরত আবু বকর (রাঃ) বা হজরত উমর (রাঃ) অথবা এমন কেউ আসছেন যাঁদের বেহেশতের সুসংবাদ আল্লাহপাক ঘোষণা করেছেন। সবাইকে অবাক করে দিয়ে মসজিদে প্রবেশ করলেন একজন সাধারণ আনসার সাহাবী। এমনকি তাঁর নাম পরিচয় পর্যন্ত জানা ছিল না অধিকাংশের।

এরপরের দিনেও সাহাবীরা মসজিদে বসে আছেন নবীজি (সাঃ) কে ঘিরে। নবীজি (সাঃ) আবার বললেন, “এখন যিনি মসজিদে প্রবেশ করবেন, তিনি বেহেশতের অধিবাসী।” সেদিনও মসজিদে প্রবেশ করলেন সেই সাহাবী।

তৃতীয় দিন নবীজি (সাঃ) সাহাবীদের লক্ষ্য করে আবার ঘোষণা দিলেন, “এখন যিনি মসজিদে প্রবেশ করবেন, তিনি বেহেশতের অধিবাসী।” এবং সাহাবীরা দেখলেন সেই অতি সাধারণ সাহাবী মসজিদে প্রবেশ করলেন।

পরপর তিনদিন এই ঘটনা ঘটার পর, সাহাবীদের মধ্যে কৌতূহল হলো সেই সাধারণ সাহাবী সম্পর্কে জানার জন্য। তিনি কেন অন্যদের চেয়ে আলাদা তা জানতে হবে। বিখ্যাত সাহাবী হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর আল আ’স (রাঃ) ভাবলেন, এই সাহাবীর বিশেষত্ব কী তা জানতে হলে তাকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। তিনি সেই সাহাবীর কাছে গিয়ে বললেন, “আমার বাবার সাথে আমার মনোমালিন্য হয়েছে, তোমার বাড়িতে কি আমাকে তিন দিনের জন্য থাকতে দেবে?’’

সেই সাহাবী রাজী হলেন। হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন, খুঁজতে থাকলেন কী এমন আমল তিনি করেন। সারা দিন তেমন কোন কিছু চোখে পড়ল না। তিনি ভাবলেন হয়তো তিনি রাত জেগে ইবাদত করেন। না, রাতের নামায পড়ে তো তিনি ঘুমাতে চলে গেলেন। উঠলেন সেই ফজর পড়তে।

পরের দুটি দিনও এভাবে কেটে গেল। হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) কোন বিশেষ আমল বা আচরণ আবিষ্কার করতে পারলেন না যা অন্যদের চেয়ে আলাদা। তাই তিনি সরাসরি সেই সাহাবীকে বললেন, “ দেখ আমার বাবার সাথে আমার কোন মনোমালিন্য হয় নি, আমি তোমাকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য তোমার বাড়িতে ছিলাম। কারণ নবীজি (সাঃ) বলেছেন যে তুমি জান্নাতি। আমাকে বল তুমি আলাদা কী এমন আমল করো?’’
সেই সাহাবী বললেন, “ তুমি আমাকে যেমন দেখেছ আমি তেমনই, আলাদা কিছু তো আমার মনে পড়ছে না”।

এ কথা শুনে হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) তাঁকে বিদায় জানিয়ে চলে যেতে থাকলেন। এমন সময় সেই সাহাবী হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) কে ডেকে বললেন, ‘আমার একটা অভ্যাসের কথা তোমায় বলা হয়নি –((রোজ রাতে ঘুমাতে যাবার আগে আমি তাদেরকে ক্ষমা করে দেই, যারা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, বা আমার প্রতি অন্যায় করেছে। তাদের প্রতি কোন ক্ষোভ আমার অন্তরে আমি পুষে রাখি না”।)) হজরত আবদুল্লাহ (রাঃ) একথা শুনে বললেন, “এ জন্যই তুমি আলাদা, এ জন্যই তুমি জান্নাতি”।

উক্ত হাদীসে জান্নাতী সাহাবীর নাম অনুচ্চারিত হলেও তিনি হলেন বিখ্যাত সাহাবী হযরত সা’দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা., যিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশ সাহাবীর একজন। যিনি ইসলামের সব যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও আল্লাহর রাস্তায় সর্বপ্রথম তীর নিক্ষেপকারী।

Leave a Reply