থাইল্যান্ড এর ফুকেট ব্যাংকক এবং পাতায়া ভ্রমণ

পরিচিত অনেকেই থাইল্যান্ডের ভিসার জন্য এপ্লাই করে পাচ্ছিল না। নাহিদ ভাই সহ অনেকে নিষেধ ও করছিল এপ্লাই না করতে। থাইল্যান্ড ঘুরতে যেতেও ইচ্ছে করছিল। চিন্তা করলাম এপ্লাই করেই দেখি। হানিমুন ট্যুরস এবং ট্রাভেলেসে পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় কাগজ পত্র জমা দিয়ে এলাম। ফ্রিল্যান্সার। কাগজ পত্র তেমন কিছু নেই। ব্যাংক স্ট্যাটম্যান্ট, ফটো, আপওয়াএর্ক প্রোফাইল এর স্ক্রিনশর্ট এই তো। আমি আর নাঈমা যাবো, তাই কাবিননামার কপি জমা দিয়েছি। তা বাংলাতে হওয়ায় নোটারি করতে হবে। ট্রাভেল এজেন্সিকেই করতে বললাম।

উনারা সব রেডি করে জমা দিয়ে আসল। দুইদিন পর থাই এমবাসি থেকে কল করছিল। আমার মোবাইল সব সময় সাইলেন্ট থাকে। এমবাসি থেকে কল করবে ভেবে রিংটোনের ভলিউম বাড়িয়ে দিয়েছিলাম। সারাক্ষণ ফোন সাথে সাথে রাখি। ঘুমাই তো দিনে। তাই বালিশের নিচে মোবাইল রেখেছি। যেন সাথে সাথেই টের পাই। বিকেলের দিকে ঘুম থেকে উঠে বাথরুমে গিয়েছি। এরপর অন্য রুমে গিয়েছি ২ মিনিটের জন্য। এসে দেখি দুইটা কল। কল ব্যাক করে দেখি থাই এমবাসির নাম্বার। এরপর অনেক বার কল দিয়েছি, তারা ধরে নাই। আমি আর নাঈমা, দুইজনেরই মন খারাপ। কারণ ফোন ধরতে না পারলে ভিসা দেয় না।

আশা খুব একটা আর ছিল না। আগেই প্ল্যান করেছিলাম যদি থাইল্যান্ডের ভিসা না পাই, তাহলে হয়তো বালি থেকে আমরা ঘুরে আসব। পরের দিন সকালে এক কাজিন ফোন দিয়েছিল। তখনো আমি ঘুমে। কথা বলে ফোন রাখার সাথে সাথে আরেকটা কল। নাম্বার দেখেই বুঝে গিয়েছি থাই এমবাসি থেকে। কথা বললাম। ওরা জিজ্ঞেস করল কি করি না করি, কয় দিনের জন্য যাবো ইত্যাদি। কল রাখার পর কি যে খুশি হয়েছি আমরা। বুঝতে পারলাম ভিসা পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এর দুইদিন পর এজেন্সি থেকে জানালো পাসপোর্ট কালেক্ট করতে। ভিসা হয়েছে। এরপরও কেন জানি বিশ্বাস হচ্ছিল না, পাসপোর্ট হাতে না পাওয়ার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না। যদিও থাই ভিসা পাওয়া এত কঠিন কিছুও না। তারপরও।

পাসপোর্ট নিয়ে আসি এপ্রিলের ১৩ তারিখে। ঐ দিন রাতেই এয়ার টিকেট, হোটেল বুকিং করে নেই। Travel Booking Bangladesh থেকে টিকেট কাটি। অনেক কম টাকায়। দুই জনের রিটার্ণ টিকেট এসেছে মাত্র ২৭৭০০ টাকার মত। থাই লায়ন এয়ারে।

আমাদের প্ল্যান ছিল ঢাকা থেকে ব্যাংকক গিয়ে ডাইরেক্ট ফুকেট চলে যাওয়া। তাই ব্যাংকক টু ফুকেট রিটার্ণ টিকেট কেটে নেই এয়ার এশিয়াতে। তিন রাত থাকার প্ল্যান ফুঁকেটে, তিন রাত ব্যাংককে।

ফ্লাইট ছিল ১৬ তারিখ, রাত ২টার দিকে। আমরা ১৫ তারিখ রাত সাড়ে এগারোটার দিকে বাসা থেকে রওনা দেই। বসুন্ধরা থেকে এয়ারপোর্ট কাছেই। ১৫ মিনিটের মধ্যেই পোঁছে যাই। এরপর বোর্ডিং পাস নিয়ে ইমিগ্রেশনে যাই। যত বার একা একা গিয়েছি, কিছু না কিছু জিজ্ঞেস করেছেই। এবার কোন কিছুই জিজ্ঞেস করল না। কোন পেপার দেখতে চাইলো না। বউ থাকার একটা সুবিধা (সবাই বিয়ে করেন)!

সময় হলে আমরা বিমানে উঠি। ঠিক মতই বিমান টেক অফ করে। ব্যাংকক পৌছি ঐ দেশের সাড়ে পাঁচটার দিকে। এরপর ইমিগ্রেশন ফরম পূরণ করে ইমিগ্রেশনের জন্য যাই। কোন কিছুই জিজ্ঞেস করে না। এরাভাল সিল মেরে পাসপোর্ট রিটার্ণ করলে আমরা বের হই। ব্যাংকক থেকে ফুকেটের ফ্লাইট হচ্ছে ৮টার দিকে। বোর্ডিং পাস নিয়ে নেই প্রথমে। কাউণ্টারে অনেক মানুষের ভিড় দেখে মেশিনে নিজেরাই বোর্ডিং পাস কেটে নেই। খাওয়া দাওয়া করতে হবে। ম্যাকডোনাল্ডে গিয়ে প্যান কেক খেয়ে নেই। থাইল্যান্ডের ম্যাকডোনাল্ড হালাল নয়। প্যানক্যাকটা হালাল ছিল। খাওয়া শেষে এরপর আমাদের কোন গেট দিয়ে বোর্ডিং হবে, তা খুঁজে নেই। খুঁজে পেতে একটু সময় লেগেছিল। গেট খুঁজে পাওয়ার পর দেখলাম একটু সময় আছে আমাদের হাতে। তাই বসে রেস্ট নিলাম কিছুক্ষণ।

১৬ তারিখ

ব্যাংকক থেকে ফুকেটের ফ্লাইট ছিল এক ঘণ্টার মত। ফুকেট পৌঁছে আমরা বের হলাম। ট্যুরিস্ট সিম এয়ারপোর্টেই বিক্রি করে। সব জায়গায় দেখতাম এয়ারপোর্টে সিমের দাম বেশি। তাই বের হয়ে কিনব ভাবলাম। এরপর ট্যাক্সি হায়ার করতে গিয়েছি, দেখি তারাও অনেক বেশি টাকা চাচ্ছে। অথচ আমাদের হোটেল মাত্র ৬ কিলো দূরে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দুইজন মিলে হাঁটা ধরলাম। এত বেশি গরম। একটু এগুতেই একটা সেভেন এলিভেন দেখতে পেলাম। সেখানে গিয়ে সিম কিনব ভাবলাম। সেখানেও সেইম দাম। পরে বুঝলাম এয়ারপোর্ট থেকে কিনলেই ভালো হতো। সিম কিনে গ্র্যাব ইন্সটল করে নিলাম। এরপর গ্র্যাবে রিকোয়েস্ট দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি হাজির। সিমের সাথে গ্র্যাবের ১০০ বাথ ডিসকাউণ্ট প্রোমো ছিল। ভালোই হলো।

হোটেল বলতে ভিলা। ছোট ছোট কটেজ। একটা ভিলাতে একটা বেড, বাথ সহ ইত্যাদি। সুন্দর লেগেছিল। বাংলাদেশ থেকেই এয়ারবিএনবি  থেকে বুক করে গিয়েছিলাম। ঐখানে যারা রিসিভ করল, তারা কি যে আন্তরিক। কি সুন্দর করে কথা বলে। পুরাপুরি ইংরেজি বলতে পারে না বা পুরাপুরি বুঝেও না। এরপর ও সব কিছু নিজ থেকেই দিয়ে গেলো আমাদের। আমরা ব্যাকপ্যাক রেখে একটু বের হলাম। জিজ্ঞেস করলাম স্কুটি রেন্ট করা যাবে কিনা। বলল যাবে। এরপর একটা স্কুটি রেন্ট করে আমরা ঘুরতে বের হলাম। কোন রেস্ট নেওয়া ছাড়াই। স্কুটি নেওয়ার সময় আমার পাসপোর্ট জমা রেখেছি।

নির্দিষ্ট কোন গন্তব্য নেই আমাদের। যে দিকে যাওয়া যায়, সে দিকেই যাচ্ছিলাম। যেতে যেতে দেখি সাইনে লেখা একটা সমুদ্র সৈকত সামনে। ঐ পথ ধরে যেতে লাগলাম। ৫ কিলো যাওয়ার পরই সৈকত দেখতে পেলাম। সৈকতে না থেমে আরো যেতে লাগলাম। সামনে কি সুন্দর পাহাড়। পাহাড়ের মধ্য দিয়ে রাস্তা। মাঝে মধ্যে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে স্কুটি চালিয়ে যেতে ভালোই লেগেছে। অনেক দূর যাওয়ার পর একটা ক্যাফেতে থামলাম আমরা। জুস খেয়ে আবার রওনা দিলাম। কিচ্ছুক্ষণ আসার পরই বৃষ্টি শুরু হলো। বৃষ্টি দেখে একজায়গায় থামলাম। বৃষ্টি কমার কোন লক্ষণ নেই। প্রায় আধা ঘণ্টার মত অপেক্ষা করতে হয়েছে। এদিকে আমাদের কি যে ঘুম পাচ্ছিল। মন চাচ্ছিল ঐখানেই ঘুমিয়ে পড়ি। বৃষ্টি কমার পর আবার রওনা দিলাম। সমুদ্র সৈকতে এসে থামলাম। ঐটা ছিল Naithon Beach। কিছুক্ষণ বীচের পাশে হাঁটা হাড়ি করলাম। অনেক গুলো রেস্টুরেন্ট ঐ দিকে। এছাড়া কি সুন্দর আম বিক্রি করছিল। বিক্রি করছিল কাঁঠালের কোষ। আমরা কিছু আম এবং কাঁঠাল কিনে রুমের দিকে রওনা দিলাম। ভাবলাম হালাল কোন রেস্টুরেন্ট পাবো পথে। পাইনি। পরে আম এবং কাঁঠাল খেয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নিলাম।

Naithon Beach

সন্ধ্যার দিকে ঘুম থেকে উঠে রওনা দিলাম ফুকেট ঘুরে দেখতে। ঘুরতে ঘুরতে চলে গেলাম একটা হালাল রেস্টুরেন্টে। ঐটা ছিল অনেক দূরে। রাতের ফুকেট দেখতে দেখতে যেতে ভালোও লাগছিল। ঐখানে গিয়ে স্প্যাগেটি এবং চিকেন বিরিয়ানি খেয়ে নেই আমরা। রেস্টুরেন্টটা সুন্দর ছিল।

সেখান থেকে গিয়েছি আমরা পাটোং বীচ এর দিকে। মূলত ফুকেট ঘুরে দেখার জন্যই। রাত তখন নয়টা। আমরা রওনা দিলাম। মোটামুটি অনেক দূর। রাত হওয়া সত্ত্বেও পাহাড়ি রাস্তায় স্কুটি চালিয়ে যেতে ভালোই লাগছিল। গিয়ে বসেছি আমরা স্টারবাক্সে। কফি খেয়ে নিলাম। পাশেই ছিল একটা ফুড কোর্ট ও শপিং মলের মত একটা জায়গা। Tambon Patong নাম সম্ভবত। অনেক সুন্দর জায়গটা। আমরা যখন গিয়েছি, বন্ধ করে দিচ্ছিল সব গুলো স্টল। এরপর ও ভালো লেগেছিল। সব দেখে রওনা দিলাম বাসার দিকে। আমাদের রুম ছিল অনেক দূরে। সাড়ে দশটার মত বাজল বাসায় পৌঁছাতে।

১৭ তারিখ

সকালে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে দুপুর। তারপর ফ্রেশ হয়ে ভাবতে লাগলাম কোথায় খাওয়া যায়। দুপুর আড়াইটার দিকে বের হলাম। ৭ কিলো দূরে একটা KFC ছিল। ঐটাতেই গেলাম। ওদের রাইস আইটেমটা দারুণ লাগল খেতে। সাথে ফ্রাইড চিকেন, আলু সিদ্ধ, আলু ভাজি ইত্যাদি। এর পরের গন্তব্য হচ্ছে বিগ বুদ্ধাহ। মোটামুটি দূরের পথ। স্কুটি থাকায় কোন সমস্যা মনে হচ্ছিল না। যেতে লাগমাল ফুকেটের সুন্দর রাস্তা গুলো দিয়ে। যাওয়ার ভিউ গুলো দেখতে ভালোই লেগেছিল। বিগ বুদ্ধাহ আসলেই অনেক বড়। এ ছাড়া ঐখান থেকে অনেক সুন্দর সমুদ্রের ভিউ দেখা যায়। দেখতে কি যে দারুণ লাগে।

বিগ বুদ্ধাহ থেকে ভিউ
বিগ বুদ্ধাহ

বিগ বুদ্ধ দেখে নেমে গেলাম সমুদ্রের কাছে। উপর থেকে যে ভিউ দেখেছিলাম, তা কাছা কাছি গিয়ে দেখে এলাম। উপর থেকেই বেশি সুন্দর লাগে। এরপর গেলাম হচ্ছে ফুকেটের শেষ মাথায়। Rawai Landing Pier এ। একটা ব্রিজের মত। অনেক বড়। সন্ধ্যার পর এই ব্রিজে হাঁটতে কি যে ভালো লেগেছিল। কি সুন্দর বাতাস। কিছুক্ষণ ছিলাম এখানে। এরপর খাবার খুঁজতে লাগলাম। কোন কিছুই পছন্দ হচ্ছিল না। শেষে KFC তেই ফিরে গেলাম। কিছু খেয়ে এরপর গেলাম স্টারবাকসে। কফি খেয়ে রওনা দিলাম পরবর্তী গন্তব্যে।

আমরা এক জায়গায় থেকে আরে জায়গায় সহজেই যেতে পারছি স্কুটির কারণে। জায়গা গুলো মোটামুটি অনেক দূরে দূরে। আমাদের কোন সমস্যা হচ্ছিল। এরপর গেলাম Karon View Point এর দিকে। সুন্দর একটা জায়গা। পাহাড়ের চূড়ায়। চার পাশ অনেক সুন্দর ভাবে দেখা যায়। আমরা গিয়েছি সন্ধ্যার পর। ভালো হয় যদি যাওয়া যায় বিকেলের দিকে। তাহলে এক সাথে দিনের ভিউ এবং রাতের ভিউ পাওয়া যেতো।

নাঈমা বলল স্কুটি চালানো শিখবে। ও সাইকেল এবং কার চালাতে পারে। চাইকেল যে চালাতে পারে, তার জন্য স্কুটি চালানো অনেক সহজ। ভিলাতে ফিরে নাঈমাকে স্কুটি চালানো শিখালাম। ও কিছুক্ষণ প্র্যাকটিস করল। এক দিনে আমাদের অনেক কিছুই দেখার সুযোগ হলো।

১৮ তারিখ

আজও ঘুম থেকে উঠতে উঠতে বিকেল হয়ে গেলো। Naithon Beach বীচে একটা হালাল রেস্টুরেন্ট ছিল। গিয়ে দেখি ঐটা বন্ধ। পরে KFC তে গেলাম। পাহাড়ি রাস্তার মধ্য দিয়ে যেতে ভালোই লাগছিল। খাওয়া দাওয়া করে রওনা দিলাম মাঙ্কি হীলের উদ্দেশ্যে।। হীলের উপড়ে স্কুটি নিয়ে যাওয়া যায় না। পাহাড়ের নিচে রেখে আমরা হাঁটা ধরলাম। উপরের দিকে হাঁটতেছি, আর ভাবছি বানর কই? 😐 দেখলাম আমরা একা না। অন্যরাও জিজ্ঞেস করতে লাগলো বানর দেখা যাবে আর কত দূর হাঁটলে? হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিল, কারণ প্রচুর গরম। এরপর ও হাঁটতে লাগলাম। বেশি দূর যেতে হয় নি, দেখতে পেলাম কত গুলো বানর। ওদের কাছে গিয়ে একটু দৌঁড়ানিও খেলাম। এরপর ভাবলাম, বান্ধরের কাছে না যাওয়াই বেটার। আস্তে আস্তে পাহাড় থেকে নেমে এলাম।

মাংকি হিলের একটা বানর ফ্যামিলি। মনে হচ্ছে সুখেই আছে তারা।

আজই ফুকেটে আমাদের শেষ রাত। ভাবলাম ফুকেটের এক পাশ দেখা হয়েছে। অন্য পাশ থেকেও ঘুরে আসি। রওনা দিলাম Sarasin Bridge এর উদ্দেশ্যে। এটি হচ্ছে সমুদ্রের মাঝখান দিয়ে একটি ব্রিজ। এটা ছোট একটা ব্রিজ। এখন যদিও পাশেই বড় একটা ব্রিজ তৈরি হয়েছে। এই পুরাতন ব্রিজটা এখনো রেখে দিয়েছে। যা মানুষ হেঁটে দেখতে পারে। ব্রিজ দুইটা ফুকেট এবং Phang-nga এর মধ্যে যাতায়তের মাধ্যম। আর যারা ব্যাংকক থেকে ফুকেট আসে, তারাও এই ব্রিজের উপর দিয়ে আসতে হয়। প্রায় ৪০ কিলো দূরে। এরপর ও রওনা দিলাম। স্কুটি নিয়ে। অচেনা রোড দিয়ে হারিয়ে যাওয়ার মত একটা অনুভূতি। এক সময় আমরা Sarasin Bridge পৌঁছাই। এরপর স্কুটি রেখে কিছুক্ষণ হেঁটে দেখি ব্রিজটা। কিছুক্ষণ বসে দুই পাশের ভিউ উপভোগ করি। সমুদ্রের দিকে তাকালে শুধু শূন্যতাই দেখা যায়। দেখা যায় মিটি মিটি আলো, আর কিছুক্ষণ পর পর ঢেউ। বড় ব্রিজটাতে উঠে দেখি ঐখানে অনেকেই মাছ ধরছে। বরশী এবং জাল দিয়ে। কি মাছ ধরছিল, স্কুটি থামিয়ে দেখলাম। এরপর রওনা দিলাম আমাদের ভিলার উদ্দেশ্যে। ভিলাতে পৌঁছে নাঈমা আজও কিছুক্ষণ স্কুটি চালানো প্র্যাকটিস করল। স্কুটি চালানো অনেক বেশি সহজ। যে কাউকে একবার দেখিয়ে দিলেই পারবে। আর আমার কাছে অনেক সেইফ একটা বাহন মনে হয়।

১৯ তারিখ

আজকের প্ল্যান ছিল ফি ফি আইল্যান্ডে যাওয়া। সকাল ৭টায় ট্যাক্সি এসেচ্ছিল। আমাদের নিয়ে নামিয়ে দিল Rassada Pier এ। আমাদের ভিলা থেকে অনেক দূর। ট্যাক্সি ভাড়া নিল ৭০০ বাথ এর মত। এখান থেকে ফি ফি আইল্যান্ডে যাওয়ার ফেরি রয়েছে। ফেরি বলতে ছোট লঞ্চ। ফি ফি আইল্যান্ডে আসা যাওয়ার খরচ ১০০০ বাথ জন প্রতি। সাড়ে আটটার দিকে আমরা ফেরিতে উঠি। সাড়ে নয়টার দিকে ফেরি ছাড়ে। মূল ভূখণ্ড থেকে প্রায় ৬০ কিলো দূরে হচ্ছে ফি ফি আইল্যান্ড। প্রায় ২ ঘণ্টার দূরত্ব। চারপাশ দেখতে দেখতে রওনা দিলাম আমরা। মাঝে মাঝে খুঁটির মত ছোট ছোট দ্বীপ চোখে পড়ছিল। যেন কেউ এক টুকরো লম্বা মাটির খণ্ড এনে সমুদ্রের মাঝখানে পুঁতে রেখেছে।

ফি ফি আইল্যান্ড যাওয়ার পথে ছোট দ্বীপ

ফি ফি আইল্যান্ডের কাছা কাছি এসে অনেক গুলো বড় বড় দ্বীপ দেখতে ফেলাম। দেখতে সুন্দর লাগছিল। কিছুক্ষণ আমাদের এগুলো দেখিয়ে নিয়ে গেলো ফি ফি আইল্যান্ডে। ফি ফি আইল্যান্ডে এত গরম। একটু হাঁটতেও কষ্ট হচ্ছিল। আবার সব কিছুর দামই কেমন বেশি। আমরা আম, আইসক্রিম, জুস, চকলেট ইত্যাদি খেলাম। এরপর এক জায়গায় বসে রেস্ট নিলাম। এখানে কোথাও বসতে গেলে টাকা দিতে হয়! আর এত বেশি গরম যে হাঁটার এনার্জি পাচ্ছিলাম না। এছাড়া রাতেও আমাদের ঘুম কম হয়েছিল।

ফি ফি আল্যান্ডের কাছের দ্বীপ গুলো

দুপুর হলে আমরা খাওয়া দাওয়া করি। বুফে স্ট্যাইলে। যদিও খাবার আইটেম অনেক কম। এরপর আড়াইটার দিকে ফুকেটের উদ্দেশ্যে রওনা দেই।

আমাদের ফ্লাইট হচ্ছে রাত সাড়ে এগারোটায়। ৫টার দিকেই আমরা ফুকেট পৌছাই। যে সময়, এই সময় না কোথাও ঘুরে দেখতে পারব না অন্য কিছু করতে পারব। তাই ভাবলাম এয়ারপোর্টের দিকে রওনা দেই। এয়ারপোর্ট কিছুটা দূরে ছিল। প্রায় এক ঘণ্টা লেগেছে। আমরা এরপর চেক ইন করে বোর্ডিং পাস নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। এরপর রেস্ট নিতে নিতে অপেক্ষা। ফি ফি আইল্যান্ডে গিয়ে এত বেশি গরম লেগেছিল যে বলার মত না। এয়ারপোর্টে তাই বসে থাকতেও ভালো লাগছিল।

রাত একটার দিকে আমরা ব্যাংকক পৌঁছাই। এরপর ট্যাক্সি নিয়ে রওনা দেই আমাদের হোটেলের দিকে। এয়ারবিএনবি  ব্যবহার করে বুক করেছিলাম। ওদের সব কিছু ছিল অটোমেটেড। গেটের লক কোড, রুম নাম্বার সব বলে দিয়েছিল। রুমে কী কার্ড এবং দরজার চাবি রাখা ছিল।

২০ তারিখ

প্রতিদিনের মত আজও দেরি করে ঘুম থেকে উঠেছি। দুপুরের দিকে। পাশে একটা KFC ছিল। কিছুদূর হাঁটতে হবে। এক কিলো মিটারের মত। এই দূরত্বে পাবলিক বাসেও যাওয়া যাচ্ছিল না, আবার ট্যাক্সি করে গেলেও পোষাবে না, তাই হাঁটা ধরলাম দুইজনে। এত গরম, কি যে বলব। এতটুকু হাঁটতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেলো দুইজনের। খাওয়া দাওয়া করে নিলাম। এরপর ভাবলাম স্কুটি রেন্ট করে নেই একটা। আসে পাশে কোথাও নেই। একটু দূরে যেতে হবে স্কুটি হায়ার করার জন্য। পাবলিক বাসে উঠলাম। গুগল ম্যাপে যে বাসের কথা বলল, ঐটাতে উঠলাম। টাকা কালেক্ট করে যে, জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবো। গুগল ম্যাপের লোকেশন দেখালাম, কারণ লেখা গুলো থাই ল্যাঙ্গুয়েজে। ও জানালো ঐ দিকে যাবে না। আমরা নেমে গেলাম পরের স্টপে। এরপর গুগল ম্যাপে আবার সার্চ দিলাম। যে বাসের কথা জানালো এবং স্টপেজ দেখাল, দেখি ঐখানে কোন বাসই থামে না। পরে একটু হাঁটতে লাগলাম। ব্যাংকক এত বেশি গরম। অল্প একটু হাঁটলেই শরীর ঘেমে একাকার হয়ে যায়।

একটা স্টপেজে বসলাম। কিছুক্ষণ বসার পর গুগল ম্যাপে দেখানো বাসে উঠলাম। উঠার পর কনট্রাকটর যখন জিজ্ঞেস করল কোথায় যাবো, দেখালাম। বাসে কয়েকজন মহিলাল ছিল। ওরা উনাকে জিজ্ঞেস করছিল আমরা কোথায় যাবো। এরপর সবাই মিলে আলোচনা করতে লাগলো। জানালো এই বাস যাবে না ঐ দিকে। আমরা আবার নেমে গেলাম। একজন মহিলা আমাদের বলল কত নাম্বার বাসে যেতে হবে। এরপর বাস আসা পর্যন্ত আমাদের জন্য অপেক্ষা করল। বাস দেখিয়ে দিয়ে আমরা উঠার পর তারপর গেলো। কি যে ভালো লাগল।

স্কুটি যেখানে রেন্ট নেয় সেখানে গিয়ে আমরা একটা স্কুটি নিয়ে নেই। দুই দিনের জন্য ৮০০ বাথ নিয়ে ছিল। এছাড়া ১২০০ বাথ নিয়েছিল সিকিউরিটি মানি হিসেবে, এছাড়া আমার NID কার্ড রেখেছিল। স্কুটি পাওয়ার পর কেমন জানি স্বস্তি লাগছিল। মনে হচ্ছিল এবার যে কোন দিকেই চলে যাওয়া যাবে। কোন চিন্তা নেই। রওনা দিলাম Grand Place এর দিকে, সুন্দর বিল্ডিং। সব কিছু অনেক গোছানো। সেখান থেকে গেলাম শহরের অন্য দিকে। কোন গন্তব্য ছাড়া। ততক্ষণে রাত হয়ে গেলো। রাতের শহর দেখতে ভালোই লাগছিল। একটা কফি শপে বসে টুনা ফিস বার-বি-কিউ এবং কফি খেয়ে নেই। এরপর বের আবার উদ্দেশ্যহীন ভাবে ঘুরতে থাকি। MBK Center এর কাছে এসে স্কুটি পার্ক করে শপিং মল গুলোতে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করি।

শপিং মলের ভেতরে

এভাবে করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। আমরা একটা রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া দাওয়া করলাম। নান রুটি, চিকেন কারি এবং আইসড মিল্ক টি। নান রুটি গুলো খেতে দারুণ লেগেছিল। এরপর আস্তে ধীরে রুমে ফিরে আসি।

২১ তারিখ

ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে চলে গেলাম একটা রেস্টুরেন্টে। ঐখানে গিয়ে দেখি পরোটা বিক্রি করে, সাথে একটা কারি নিয়ে আমরা সকালের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর চা। পরোটা গুলো খেতে ভালোই লেগেছিল। পরের গন্তব্য? পাতায়া!

ব্যাংকক থেকে পাতায়া ১৫০ কিলো দূরে। আমরা রেন্ট নিয়েছি মাত্র ১০৯ সিসির একটা স্কুটি। তখন অলরেডি বিকেল হয়ে গিয়েছে। ৪টা বাজে। সাহস করে রওনা দিলাম পাতায়ার উদ্দেশ্যে। গুগলে দেখাচ্ছিল আড়াই ঘণ্টা লাগবে। আমাদের কোন তাড়া নেই। যেতে লাগলাম। এক জায়গায় দেখলাম জাল মেরে মাছ ধরছিল, তা দাঁড়িয়ে কিছুক্ষন দেখলাম। আবার রওনা দিলাম। রাস্তা গুলো এত সুন্দর। ভিউ দেখতে দেখতে যেতে লাগলাম। ফুয়েল শেষ হয়ে গেলে ফুয়েল নিলাম। মাঝে মধ্যে দাঁড়িয়ে এটা সেটা খেয়ে নিলাম। এরপর সাড়ে সাতটার দিকে আমরা পাতায়া পৌছালাম। লিটল ওয়াক নামক একটা জায়গায় বসে স্ট্রীট ফুড খেয়ে নিলাম। কি সুন্দর করে কাবাব বানিয়ে দিচ্ছিল। খাওয়া দাওয়া করে পাতায়া বীচে গেলাম। ছোট্ট একটা বীচ।

রাতে পাতায়া বীচ

বীচের মধ্যে প্লাস্টিকের ব্লক দিয়ে হাঁটার রাস্তা করা দেওয়া ছিল। পড়ে যাওয়ার চান্স থাকা সত্ত্বেও ঐ ব্লক গুলোতে হাঁটতে লাগলাম। সমুদ্রের দিকে! কিছুক্ষণ পর নাঈমাকেও ডাক দিলাম। সেও আসল। ভালোই লাগল। কিছুক্ষণ বীচে থেকে এর বের হলাম। স্টারবাক্সে বসে কফি খেলাম। পাশেই একটা কনসার্ট হচ্ছিল। কিছুক্ষণ দেখে রওনা দিলাম। ব্যাংককের উদ্দেশ্যে।

তখন রাত হয়ে গিয়েছিল। রাস্তা বলা যায় ফাঁকা। অনেক প্রশস্ত রাস্তা। আবার উপরে এক্সপ্রেস ওয়ে রয়েছে। ১০০ সিসির স্কুটি চালাতেও ভালো লাগছিল। ভাবতেছিলাম Yamaha R1 থাকলে কেমন হতো!

ব্যাংকক এসে একটা ইয়ামেনী রেস্টুরেন্টে ঢুকে ল্যাম্ব বিরিয়ানি খেয়ে নিলাম দুইজনে। এরপর রুমে ফিরলাম।

২২ তারিখ

আজ রাতে আমাদের ফ্লাইট। তো ঘুম থেকে উঠি দেরি করে, এটাই স্বাভাবিক। আর ঘুম থেকে উঠার পর ফ্রেশ হয়ে রুম চেক আউট করে আমরা ব্যাকপ্যাক নিয়ে বের হলাম। স্কুটিটা নিয়ে বের হয়ে নাস্তা করে নিলাম। এরপর গেলাম লিটল চায়না এর দিকে। কিছুক্ষণ ঘুরে দেখে গেলাম একটা পার্কের দিকে। এত বেশি গরম যে, পার্কে ঢুকার সাহস করিনি। স্টারবাক্সের একটা ব্রাঞ্চ খুঁজে বের করে কফি খেলাম। ওদের কোকোনাট কেকটা কি যে সুন্দর। খেতে এত বেশি দারুণ। এরপর চলে গেলাম স্কুটিটা জমা দিতে।

স্কুটি জমা দিয়ে গেলাম Iconsiam এ। একটা শপিং কমপ্লেক্স। এত সুন্দর সব কিছু, এত পলিশড। ঘুরে ঘুরে দেখলাম কিছুক্ষণ। পরে দেখি অ্যাপল স্টোর। না ভিজিট করি কিভাবে? গেলাম। অ্যাপল স্টোর থেকে বের হওয়া যায়, বসা এবং ভিউ দেখার জন্য অসাধারণ একটা জায়গা। ব্যাংককের কি সুন্দর ভিউ দেখা যায় ঐখানে।

Iconsiam এর ফাউন্টেন এর শো

Iconsiam এর নিচে দেখলাম ফেরি। ফেরিতে চড়ে ঘুরলাম কিছুক্ষণ। নদীর অপর পাশে গিয়ে নামলাম। এরপর বাসে করে গেলাম অন্য একটা শপিং মলে। MBK Center এর কাছেই। ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এলো। আমরা বসে খাওয়া দাওয়া করে নিলাম কিছু। চকলেট সহ এটা সেটা কিনলাম। এরপর ফ্লাইট হচ্ছে রাত সাড়ে এগারোটায়। আস্তে আস্তে ভাবলাম রওনা দেই। রওনা দিলাম স্কাই ট্রেন এ করে। তা শেষ হয়ে যাওয়ার পর উঠলাম মেট্রোতে। মেট্রো থেকে নামার পর গ্র্যাবের মাধ্যমে গাড়িতে করে চলে গেলাম এয়ারপোর্টে।

বোর্ডিং পাস, ইমিগ্রেশন শেষে অপেক্ষা। খাওয়া দাওয়া করে নিলাম কিছু। এরপর সময় হলে বিমানে উঠি আমরা। বৃষ্টি হচ্ছিল খুব। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বিমান চলতে শুরু করল। ঠিক মতই টেকঅপ করল। বিপত্তি শুরু হলো একটু পর। বাহিরে দেখি মেঘ আর বজ্রপাত। এসব দেখে অভ্যস্ত। মেঘের উপর উঠে যাওয়ার পর আর সমস্যা থাকবে না। কিন্তু কিছুক্ষণ পর বিমান হুট হাঁট করে উপড়ে উঠা শুরু করল আবার নিচের দিকে পড়ে যেতে লাগল। ভয়ে অস্থির সবাই। একজন চিৎকার করে উঠল। আরো বড় কিছু অপেক্ষা করছে কিনা চিন্তা করতে করতে এক সময় বিমান স্ট্যাবল হলো। এরপর বাকি সময় গুলো কিছুটা ভয়েই কাটল। বাংলাদেশে ল্যান্ড করার পর স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম। শুকরিয়া আল্লাহর কাছে। সব কিছু ভালোয় ভালোয় শেষ হলো।

One thought on “থাইল্যান্ড এর ফুকেট ব্যাংকক এবং পাতায়া ভ্রমণ

  1. সুন্দর, গোছানো আর ধারাবাহিক লেখাটা পড়ে কি যে ভাল লাগল জাকির ভাই, বোঝাতে পারব না। 🙂

Leave a Reply