একজন ফটোগ্রাফার বা একটি প্রেমের গল্প


দুপুরে সারাক্ষণ বৃষ্টি হয়েছে বলে বিকেলে আর মাঠে যাই নি। মাঠ ভেজা থাকবে, খেলতে পারব না। তাই ছাঁদে উঠলাম। ছাঁদে উঠার অভ্যাস নেই আমার। ছোট বাচ্চারা ছাদে উঠে, দৌড়া দৌড়ি করে। আমি এখন আর ছোট নেই। অনেক বড় হয়ে গিয়েছি। কলেজে পড়া একটা ছেলে কে কি ছোট বলা যায়? আর ছাদে উঠে বেশির ভাগ মেয়েরা, তাই কিছুটা লজ্জাও করে।

আমাদের বিল্ডিং এর দুই বিল্ডিং পর চার তলায় গিয়ে আমার চোখ আটকে গেলো। একটি মেয়েকে দেখে। আমাদের বিল্ডিং ছয় তলা, তাই উপর থেকে নিচে সুন্দর ভাবে দেখা যায়। গ্রিন ফতুয়া আর আকাশী রঙের জিন্সে মেয়েটিকে কেমন অসাধারণ সুন্দর দেখাচ্ছে। তার উপর বিকেল বেলার বৌ দেখা আলো মেয়েটির গায়ে পড়ছে। আমি চোখ ফেরাতে পারি নি। অনেকক্ষণ দেখার পর মেয়েটি আমাদের ছাদের দিকে তাকানোতে আমি চোখ ফিরিয়ে নিলাম। চোখে ঝিলমিল লেগে গেছে । এতদিন কেন এ মেয়েটি আমার চোখে পড়ে নি?

পকেটে আমার Nokia 6300 মোবাইল। ক্যামেরা মাত্র 2.o মেগা পিক্সেল। তারপর ও আমি মোবাইল বের করে ফটো তুলতে লাগলাম। একটা ছবিও সুন্দর আসে না। এত দূর থেকে যে মাত্র দুই মেগা পিক্সেলের ক্যামেরা দিয়ে ছবি ঠিক আসবে না আসবে না তা জেনেও কেমন জানি বোকার মত আপসোস করতে লাগলাম।

সূর্য ডোবা শুরু করছে। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।  চারদিকে মাগরিবের আজান দিল। মেটি চলে গেলো ছাদ থেকে। আমার মনে হলো কি জানি হারিয়ে ফেলছি। কিন্তু কি হারিয়েছি তা আমি জানি না।

ক্লাসে এত মেয়ে, তা ছাড়া স্কুলেও কত মেয়ের সাথে ক্লাস করেছি আমার কোন দিন ও এমন লাগে নি। ছটফট করছি সারাক্ষণ। এটা বাসার কারো চোখে এড়িয়ে যায় নি। আম্মু বলল নিলয়, কোন সমস্যা? এমন কর কেন? আমি বললাম, কোথায়? সব ঠিক আছে বলেই সরে পড়লাম।  Something wrong!

কোথাও যেন পড়ছিলাম  “তুমি যখন কোন মেয়ের প্রেমে পড়বে তখন সব জাগায় ঐ মেয়েকে দেখবে” আমি কি প্রেমে পড়ছি? প্রেমে পড়া কি এতই সহজ? একটা মেয়েকে দেখলাম আর ঐ মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলাম? কেমন যেন অবিশ্বাস্য।

পড়তে বসছি, পড়া ভাল্লাগে না। মেয়েটির মুখটি ভেসে উঠে। হালকা লম্বা একটি মুখ। দুধে আলতা কালারের নাম শুনছি। মনে মনে একটা ধারনা ছিল কেমন হবে তা। মেয়েটিকে দেখার পর মনে হলো একেই বলে দুধে আলতা। দূর থেকে ভালো দেখা যায় না। মন চায় মেয়েটির সামনে গিয়ে সারাক্ষণ দেখি।

বাসায় পয়েন্ট এন্ড স্যুট দশ মেগা পিক্সেলের একটি ক্যামেরা ছিল। তা নিয়ে পরের দিন ছাদে গিয়ে আগে আগে অপেক্ষা করলাম কখন মেয়েটি আসে। অপেক্ষা করার মত জঘন্য কাজ একটিও নেই। সময় একটুও কাটতে চায় না।

তাই এদিক ওদিক দেখে কয়েকটি ছবি তুললাম। একটা কাক বসে ছিল রেলিং এ। তার ছবি, একটি ঘুড়ি দূর আকাশে উড়ছে তার ছবি একটি ছাদে কয়েকটি ছেলে মেয়ে মিলে কানা মাছি বোঁ বোঁ, যারে পাবি তারে ছৌঁ খেলছে, তাদের ছবি। সময় কাটেনা বলেই হয়তো, অথচ আগে কোন দিন আমি ক্যামেরা ধরেও দেখি নি।

অনেক প্রতীক্ষার পর মেয়েটি আসল। লাল ফতুয়া আর লাল স্কার্ট পরে। গতকালের থেকেও যেন বেশি সুন্দর লাগে। কে কি বলবে কোন কিছু না মেনে আমি অনেক গুলো ছবি তুললাম। আজ ও আমার মন মত একটা ছবিও উঠে নি। বুঝলাম এ ক্যামেরা দিয়েও হবে না। DSLR লাগবে।

রাতে ছাদে তোলা কিছু ছবি বাসায় সবাইকে দেখালাম, অবশ্যই মেয়েটির ছবিগুলো ছাড়া। কিছু ছবি ফেসবুকে আপলোড করলাম। সবাই দেখে বাহ বাহ দিতে লাগল। যদিও ছবি গুলো আমি খেয়ালি ভাবে তুলছি।

আম্মুকে বললাম মা একটা DSLR কিনব। মা রাজি হয় নি। শেষ ভরসা বাবা। বাবাকে ধরলাম, অনেক বলে রাজি করানো গেল। বলছে কিনে দেবে। অপেক্ষা করতে।

এখানেও অপেক্ষা। দিন গুনতে থাকি, কিন্তু অপেক্ষা শেষ হয় না।  বাবাকে প্রতিদিনই স্মরণ করিয়ে দি।

প্রতিদিন বিকেল বেলায় ছাদে। মাঠে যেতে ভুলে গেছি। রাতে একটু হাটতে বের হয়েছি, বন্ধুরা জিজ্ঞেস করে আমি কেন খেলতে আসিনা। নাবিল হারমজাদা বলে “ নিলয় বাসায় বসে বসে  ডিম পাড়ে” আর সবাই হে হে করে হেসে উঠে। আমি বলি শালা, আমি ছেলে। ডিম পাড়ে মেয়েরা। আবার বলে “তাহলে মেয়েদের মত বাসায় বসে কি করছ? অন্য কোন কাহিনী আছে নাকি” আমি বলি না অন্য কোন কাহিনী নেই। প্যাট প্যাট করিস না। টপিক্স পরিবর্তনের জন্য আমি জিজ্ঞেস করলাম চা খেলে অর্ডার দে।

বিকেল বেলায় আমার এখন যত কাজই থাকুক সব কাজ বাদ দিয়ে ছাঁদে চলে আসি। যেখানেই থাকি না কেন বিকেল বেলায় ছাদ। মেয়েটির মধ্যে মনে হয় কোন জাদু আছে। আমি তো এত ভদ্র-ছেলে না যে ঠিক মত কোন কাজ করব।

আমার প্রতীক্ষার DSLR আসল। আব্বু সহ নিজে গিয়ে কিনে আনলাম। মেয়েটির ছবি তুলি প্রতিদিন বিকেলে। তখন যেন মনে হয় DSLR দিয়ে ছবি তুলেও আমার কিছু হবে না। মেয়েটির সাথে কথা বলা দরকার। মেয়েটি কি বুঝে না আমি আমি ক্র্যাশড অন হার?

কিভাবে মেয়েটির সাথে কথা বলি তা নিয়ে দিন রাত ভাবি। কেন যে আমার সাথে তার সাথে নিচে দেখা হয় না।

ফেসবুকে আমার তোলা অন্যান্য ছবি দেখে এবং হাতে সব সময় ক্যামেরা দেখে ফটোগ্রাফার হিসেবে এলাকায় পরিচিত হয়ে গিয়েছি। ছোট খাটো যেকোনো অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হয় ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। ছবি তুলতে দেখি ভালোই লাগে। সাথে ভালো মানের কিছু টাকাও পাওয়া যায়।

এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে গিয়েছি। ছবি তোলার দায়িত্ব আমার। ছবি তুলতে তুলতে এক জাগায় আমার লেন্সের ফোকাস গিয়ে আটকে গেলো। আমি ভুল দেখি না তো! ছাদের ঐ মেয়েটি! ক্যামেরা সরিয়ে দেখলাম। নাহ! আমি ঠিকই দেখেছি। সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অনেক গুলো ছবি তুলে নিলাম।

ফটোগ্রাফিতে আর আমার মন নেই। মেয়েটি কোথায় কোথায় যাচ্ছে সে দিকে নজর রাখছিলাম। আর মনে মনে কি বলব তা ঠিক করে নিচ্ছিলাম। একা পেয়ে সুযোগ হারাতে চাই নি। অনেক কিছুই চিন্তা করে রাখছিলাম বলার জন্য। কিন্তু কিছুই বলা হলো না, মুখ দিয়ে শুধু বের হলো কেমন আছেন?

আর উত্তরের অপেক্ষায় ছিলাম, উত্তর দিবে কি দিবে না তা নিয়েও আমি চিন্তিত। মেয়েটি উত্তর না দিয়ে বলল আপনাকে আমি চিনি। বুকের ভেতর কেমন করে উঠল, কি চিনে? আমি জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে? বলে প্রতিদিন ছাদে আপনাকে দেখি।

সে থেকে শুরু কথা বলা। শেষ নেই। বিয়ে বাড়ির খাওয়া দাওয়া ছেড়ে আমার ফটোগ্রাফি ছেড়ে হাটতে হাটতে অনেক দূর চলে আসছি আমরা। একদিনেই আপনি থেকে তুমিতে। মনে হচ্ছিল যেন কতদিনের পরিচিত। সত্যিই তো পরিচিত। শুধু কথা বলা হয় না। আমি তো প্রতিদিনই মনে মনে কত কথা বলতাম। নিজে নিজে চিন্তা করে নিতাম সব কিছু। আজকের আগ পর্যন্ত আমি জানতামই না মেয়েটির নাম নিরা।

আজ কেমন জানি সব কিছু ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে যেন আমি পাখির মত উড়ছি। ইচ্ছে মত যা ইচ্ছে তাই করতে পারছি।

তারপর থেকে সময় ফেলেই এক সাথে আমরা বের হয়ে পড়তাম।  কম সময় হলে আশে পাশেই ঘুরতাম। আর বেশি সময় হলে রিক্সা ভ্রমণ করে দূর কোথায়ও চলে যেতাম। মনে হতো রিক্সা শুধু একটা ছেলে আর একটা মেয়ের জন্যই তৈরি। তৈরি আমাদের জন্য। এত বেশি ভালো লাগত যে তা প্রকাশ করা যাবে না। আমার সাথে থাকত আমার ক্যামেরা। আর মডেল নিরা। এত বেশি ছবি তুলছি যে আমার হার্ডডিস্কে জায়গা নেই নতুন ছবি রাখার। অন্যদের ছবি তাই ডীলেট করে নিরার ছবি দিয়ে কম্পিউটার ভরে ফেললাম।

আস্তে আস্তে পরীক্ষার সময় ঘনিয়ে আসল। আমি আমার পড়ালেখা নিয়ে মোটামুটি ব্যস্ত নিরা তার পড়া লেখা নিয়ে। আমাদের মাঝে চুক্তি হলো পরীক্ষা শেষে এক সাথে ঘুরতে যাবো দূরে কোথাও। পরীক্ষার মাঝে যোগাযোগ কম হচ্ছিল।

পরীক্ষা শেষ হবার পর আমাদের ঘুরতে যাওয়ার পালা। নিরা তার বাসায় বলবে তার বান্ধবীদের সাথে ঘুরতে যাবে, এদিকে বান্ধবীদেরও ম্যানেজ করে রাখবে। আমাদের সব প্ল্যান রেডি, বের হবো আমরা। আগে থেকে কোন প্ল্যান নেই।   বাস স্ট্যান্ড গিয়ে ঠিক করব কোথায় যাবো। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই যেন যেতে পারি।

আমাদের ভ্রমণের মাঝে বাধা হয়ে আসল নিরা কে দেখতে আসা এক ফ্যামিলি নিয়ে। আমাদের ভ্রমণ ক্যানসেল হয়ে যাচ্ছে তখন আমার এ চিন্তা থেকে আরো ভয়ঙ্কর চিন্তা আমাকে আক্রমণ করল। যারা দেখতে আসবে তারা যদি নিরাকে পছন্দ করে ফেলে। তাহলে আমার কি হবে? আমি কি করব? নিরার কি সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে যাবে? আমি কি কিছুই করতে পারব না? নিরার বাবা মা কে কি কিছু বলতে পারব না? তাদের কি বলতে পারব না যে নিরার যেন বিয়ে না দেয়? এত কিছু নিয়ে আমি তখন ভাবতে পারি নি।  ভাবতে গেলেই আমার মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যেতো।

পরের দিন জানতে পারলাম নিরাকে তারা পছন্দ করে ফেলছে। যে মেয়েকে পছন্দ না করে পারা যায় না, তাকে তো পছন্দ করবেই। আর নিরার বাবা মা রাজী। উচ্চ বংশের ছেলে। ছেলের অনেক টারা রয়েছে। প্রতিষ্ঠিত। মেয়ে সুখে থাকবে।

আমার তখন হঠাৎ করে বড় হয়ে যেতে ইচ্ছে করছিল। কেন আরো কয়েক বছর আগে পৃথিবীতে আসি নি প্রতিদিন তাই মনে হচ্ছিল। নিজেকে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর মনে হচ্ছিল। বাস্তবতার কাছে অনেক বেশি অসহায় একটা ছেলে।

নিরার সাথে বিয়ের আগে আরো কয়েকবার দেখা হয়েছিল, প্রতিবারই নিরা কাঁদছিল। কোন কথা বলতে পারে নি। আমিও কোন কথা খুঁজে পাই নি বলার জন্য। বার বার মনে হচ্ছিল নিরাকে নিয়ে অন্য কোন গ্রহে চলে যেতে। সম্ভব হলে হয়তো তাই করতাম।

আমি কিছুই করতে পারি নি। নিরার বিয়ের দিন ঠিক হয়ে যাওয়ার পর থেকে রুমের দরজা আটকিয়ে নিরার ছবি দেখতাম আর চোখের জল ফেলতাম। কেমন জানি অসহায় লাগত। পৃথিবীর কাউকে বুঝানো যাবে না।

সব কিছু কেমন অর্থহীন মনে হতো। বাবা মা কিভাবে না কিভাবে সব কিছু বুঝতে পারে। আমার অবস্থা দেখে বাবা কিভাবে না কিভাবে আমাকে পড়ালেখার জন্য অস্ট্রেলিয়া পাঠানোর ব্যবস্থা করে ফেলল।

বিমানবন্দরে বাবা মা দুই জনই আসল। ইতিমধ্যে আমি মনে হয় অনেক চোখের জল ফেলছি, তাই আমার চোখ দিয়ে আর কোন পানি বের হচ্ছে না। কিন্তু মা বাবা দু জনরই চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছে। চলে আসছি অচেনা এক দেশে।। যেখানে মা নেই, বাবা নেই আর নিরাও নেই।

নিরা সাথে না থাকলে ও নিরার থেকে পাওয়া একটা জিনিস আমার সাথে রয়ে গেছে আর তা হচ্ছে ফটোগ্রাফি। নিরাকে দেখেই শুরু করছিলাম। আজ ও রয়েছে। থাকবে হয়তো আজীবন।

এখানে এসে পড়ালেখার পাশি পাশি কিছু ফটোগ্রাফি কন্টেস্টে অংশগ্রহণ করলাম। ছোট ছোট কিছু পুরষ্কার পেতে লাগলাম। ভিবিন্ন এক্সহিবিশন ফটো-জমা দিলাম। দারুণ সাড়া ফেলাম। ভিবিন্ন ম্যাগাজিন থেকে ফটোগ্রাফির অফার পেতে লাগলাম। আস্তে আস্তে হয়ে উঠলাম একজন ওয়াইল্ড ফটোগ্রাফার । সবকিছুই আমাকে নিরার কথা মনে করিয়ে দেয়। জীবনে কোথাও আমি আর হারি নি, অন্য কোন বিষয় নিয়ে আপসোস কিংবা হতাশায় ভুগি নি একটি ছাড়া। তা হচ্ছে নিরা। আমার নিরা!
দেশে আসার পর নিরার সাথে দেখা করার জন্য প্রতিদিনই মন ছটপট করত, ইচ্ছে করত দুজন মিলে বসে আগের ছবি গুলো দেখতে। ইচ্ছে করলেই সব কিছু করা যায় না। কিছু ইচ্ছে পূরনও হয় না। একদিন হবে সেই আশা নিয়েই ছোট্ট এ জীবন পার করে দেওয়া যায়।


3 thoughts on “একজন ফটোগ্রাফার বা একটি প্রেমের গল্প

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *