ইউনিভার্সিটি ভর্তি এবং অন্যান্য

ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে অনেকেই পাস মার্ক তুলতে পারে নি, বিষয়টা লজ্জাকর? জানি না, তবে কিছু বিষয় ভাবনা যোগায়।

ছেলেমেয়েরা আগে যত বেশি পড়ালেখার পেছনে সময় ব্যয় করত, দিন দিন আরো বেশি সময় ব্যয় করে পড়ালেখার পেছনে। অভিবাবকেরা ছেলেমেয়েদের শিক্ষার প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছে আগের তুলনায়। পাশের হার বেড়েছে, প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, তাই বলে ছেলেয়েমেরা পড়ালেখা করে না, এটা ঠিক না। যারা পড়ালেখা করার তারা ঠিকই পড়ালেখা করছে। ভবিষ্যৎ এ ও করবে।

ঢাকা ইউনিভার্সিটির পরীক্ষা নিয়ে বেশি আলোচনা, তাই নিয়েই লেখা যাক। পুরো দেশটাই এক কেন্দ্রিক। সবাই চায় ঢাবি বা বুয়েটের মত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে। তা ছাড়া ফ্যামিলি বা পরিবেশ থেকে একটা ধারণা জন্ম নেয় যে, ঢাবি, বুয়েট, মেডিকেলে চান্স না ফেলে জীবন বৃথা। নিজেদের সে ভাবে প্রস্তুত করে। অল্প কয়েকটা সিট, তার বিপরীতে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী। প্রশ্ন সবার উপযোগী করে তৈরি করলে তো সমস্যা। বিশাল সমস্যা। সবাই ভালো করবে। তারপর কিভাবে এই অল্প কয়েকটা আসনের মধ্যে ছাত্র ছাত্রীকে বণ্টন করবে? কারণ একই নাম্বার যদি অনেকেই পায়, এবং একই GPA থাকে, তখন সিট বণ্টন সত্যিই দূরহ হয়ে উঠবে। আর এটা ঠেকাতে প্রতিবছরই প্রশ্ন কঠিন থেকে কঠিনয়তর করা হচ্ছে। ফলাফল আমরা দেখতে পাচ্ছি।

জাফর ইকবাল স্যারের এ বিষয় নিয়ে একটা লেখা পড়েছি, প্রশ্ন তৈরিকারী ইচ্ছে করলে সহজ একটা বিষয়ের প্রশ্নই কঠিন করে তুলতে পারে। তাই করা হচ্ছে।

আরেকটা বিষয় নিয়ে একটু ভাবা যাক। আমাদের ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা দিতে হলে এক রকম করে প্রিফারেশন নিতে হয়। বুয়েটে পরীক্ষা দিতে হলে এক রকম করে প্রিপারেশন নিতে হয়। মেডিকেলে একরকম… প্রত্যেক ইউনিভার্সিটি নিজ নিজ নিয়মে, নিজ নিজ সিলেবাসে প্রশ্ন তৈরি করে। আর ছাত্র ছাত্রীদেরকে এসব কিছুই মাথায় রাখতে হয়। নিজেদেরকে সেভাবে তৈরি করতে হয়। এসব কতটা পরিশ্রম সাধ্য, যারা প্রস্তুতি নেয়, তারাই বুঝে। এত সব করেও কি নিজের পছন্দের ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারে? বা পড়তে পারে নিজের পছন্দের বিষয়টি?

না, অনেক ক্ষেত্রেই তা হয় না। কারো পছন্দ হচ্ছে পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়া, কিন্তু সিরিয়ালে পেছনে থাকার কারণে জীব বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে হয়। কারো পছন্দ ইলেক্ট্রনিক্স নিয়ে পড়া, পরে পড়তে হয় পানি উন্নয়নের উপর। কেউ যদি আর্কিটেকচার নিয়ে পড়তে চায়, চান্স না পেয়ে পড়তে হয় কম্পিউটার নিয়ে… এভাবেই চলছে। অনেক পরিশ্রম করে প্রিফারেশন নিয়েও এক ধরনের প্রবঞ্চনার শিকার হতে হয়। এত কিছুর পর ও যদি কেউ বলে, ছাত্রছাত্রীরা পড়ালেখা করছে না, তাহলে তাদেরকে এক ধরনের অপবাদ দেওয়া হয়।

এ ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীরা কি করতে পারে, তা নিয়ে লেখা যাক। তারা কি করতে পারে? সবার আগে ছাত্রছাত্রীরা যে কাজটি করতে পারে, তা হচ্ছে তাদের স্বপ্ন কে আরেকটু বড় করতে পারে। ঢাবি বা বুয়েট বাংলাদেশের মধ্যে সেরা। বাংলাদেশের চিন্তা না করে যদি গ্লোবাল চিন্তা করি, তাহলে দেখব এগুলো থেকে হাজার গুন ভালো ইউনিভার্সিটি রয়েছে। ছোট কাল থেকে স্বপ্ন দেখে এসেছে যে ঢাবি বা বুয়েটের মত ইউনিভার্সিটিতে পড়বে। কারণ এগুলো সেরা, দেশের মধ্যে। কিন্তু চিন্তাটাকে সম্প্রসারিত করে এমন চিন্তা করলে কি সমস্যা যেঃ এরোনেটিক্স এ পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো ইউনিভার্সিটিতে পড়ব। ইলেক্ট্রনিক্স এ সবচেয়ে ভালো যে ইউনিভার্সিটি, তাতে পড়ব। আর্কিটেক্ট এ ভালো যে ইউনিভার্সিটি, তাতে কেন আমি পড়তে যাবো না? রোবট নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা যে ইউনিভার্সিটিতে হয়, তাতে কেন আমি পড়তে যাবো না? হ্যাঁ, স্বপ্নটাকে বড় করা দরকার।

ঐ সব ইউনিভার্সিটিতে আমাদের মত ছাত্রছাত্রীই পড়ে। তাছাড়া ঐসব ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করা বাংলাদেশের যে কোন পাবলিক ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক অনেক সোজা। TOEFL/IELTS, SAT/CAT এসব এর স্কোর, একাডেমিক স্কোর, নিজ সম্পর্কে একটা রচনা, কেন ঐ বিষয়টি পড়তে ইচ্ছুক, আর কিছু না। একবারই পরীক্ষা দিতে হয়। একই স্কোর দিয়ে ইচ্ছে মত ইউনিভার্সিটিতে আবেদন করা যায়। একটা না একটা ভালো ইউনিভার্সিটিতে এডমিশন হবেই হবে। আমাদের দেশের পাবলিক ইউনিভার্সিটি গুলোর মত প্রতিটাতে আলাদা আলাদা করে পরীক্ষা দিতে হবে না। আর পুরো প্রসেসটাই বাসায় বসে ইন্টারনেটের মাধ্যমে করা যাবে।

TOEFL, IELTS এসব টেস্ট ভার্সিটির এডমিশন টেস্ট থেকে অনেক অনেক সোজা। বিশ্বাস না হলে এসব টেস্ট এর প্রশ্ন আর বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর প্রশ্ন মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। আর এগুলোতে ভালো একটা স্কোর করলে ভালো ইউনিভার্সিটিতে স্কলারশিপ সহ পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। আবার কোন কোন দেশে ইউনিভার্সিটির খরচ সম্পুর্ণ ঐ দেশের সরকার বহন করে। তাই বিনে পয়সায় পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়।

বিদেশ পড়তে যাওয়া হয়তো অনেকেই মনে করে যথেষ্ট ব্যয় বহুল। ভুল ধারনা নিয়ে অনেকেই জানতেও চায় না। টিউশন ফি টা যদি মকুপ হয়, তাহলে আর থাকে থাকা আর খাওয়ার খরচ। বাংলাদেশে থাকলেও এ খরচ গুলো বহন করতে হবে। হয়তো বাংলাদেশ থেকে খরচ তুলনামূলক ভাবে একটু বেশি হবে। নিজের পড়ালেখার পাশাপাশী যা ছোটখাটো কাজ করে অনেকটাই বহন করা সম্ভব।। এসব সম্পর্কে অনলাইনে যথেষ্ট আর্টিকেল রয়েছে। একটু ঘাটলেই পাওয়া যাবে। লেখার কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের পাবলিক গুলতে খারাপ করলে বা পছন্দের বিষয় না পেলে আরো অনেক সুযোগ রয়েছে এই বিশাল পৃথিবীতে, তা জানানো। স্বপ্নকে বড় করা, আর কিছু না। ঢাবি, বুয়েট থেকেও ভালো ভালো ইউনিভার্সিটি পড়ে রয়েছে। ঢাবি, বুয়েটের মত ইউনিভার্সিটিতে পড়ে এরপর উচ্চ শিক্ষার জন্য অনেকেই বিদেশেই পাড়ি জমায়। তাই এসবে না পড়ে আগেই যদি যাওয়া যায়, তাহলে সমস্যা কোথায়?

সবার জন্য শুভকামনা…

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *